এখন নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে

বহায়দার আকবর খান রনো, প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
প্রশ্ন : টাঙ্গাইলে ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর হাতে ৪ জন নিহত হয়েছেন। এই বিষয়টি কী আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে ইঙ্গিত করে না?
হায়দার আকবর খান রনো : রাষ্ট্র ক্রমাগত স্বৈরাতান্ত্রিক কর্তৃত্বতান্ত্রিক বা আরো বললে একটা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো আগে থেকেই বেপরোয়া হয়ে আছে। আগেও আমরা দেখেছি, ছোট ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেভাবে তারা মারমুখি হয়ে ওঠে। আর এখানে তো তারা নিজেরাই করলো গুলি। পত্রিকায় দেখলাম, আবার আসামি করেছে সাধারণ মানুষকে। রাষ্ট্রই তো তাদের অনুমতি দিচ্ছে। আরো খারাপ ঘটনা হচ্ছে গুম-খুন এগুলোতে পুলিশ প্রশাসনকে লেলিয়ে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এবং আশ্রয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগ এরাও অস্ত্র হাতে নিয়ে গুন্ডামি করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ করছে। গত কর্পোরেশন ইলেকশনের সময় আমাদের ওপর ছাত্রলীগের গুন্ডারা এসে আক্রমণ করলো পুলিশের সহায়তায়। কিছুদিন আগেও টিএসসিতে নারীদেরকে লাঞ্চনা করার সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলো। কিছুই করলো না। আবার সেটার যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা হলো তার ওপরও আক্রমণ করলো। এটা তাদের ধর্মে পরিণত হয়েছে। গুলি করা তাদের কাছে কিছু না। গুম-খুন সবই করে চলেছে। এটা করতে পারছে কারণ সরকার তাদের অনুমতি দিচ্ছে। সরকার এখন যতবেশি গণবিচ্ছিন্ন হচ্ছে ততবেশি পুলিশ-র‌্যাবের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে এবং তার দলীয় মাস্তান বাহিনীর উপর নির্ভরশীল হচ্ছে। দলীয় মাস্তান বাহিনীকে দিয়ে নেতারা অপকর্মগুলো করাচ্ছে। ভোট কেন্দ্র দখল করার জন্য যখন মাস্তানদের লেলিয়ে দেয়া হবে, তখন তারা কেবল ভোটকেন্দ্র কেন দখল করবে? তারা তখন ব্যক্তিগতভাবে জমি দখল করবে, সম্পত্তি দখল করবে, নারী দখল করবে। এগুলোই তো করে বেড়াচ্ছে।
প্রশ্ন : সম্প্রতি শিশু নির্যাতনের বেশকিছু ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে। এ ধরনের ঘটনা শিশুদের মানসিকতা এবং বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?
রনো : শিশুদের ওপর ঘটা করে নির্মম ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন দেখলে হবে না। সামগ্রিকভাবে একটা সামাজিক অবক্ষয় তৈরি হয়েছে। এটা হচ্ছে রাজনৈতিক অবক্ষয়েরই একটা রূপ। রাজনৈতিকভাবে যতবেশি স্বৈরতান্ত্রিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে, ততবেশি আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। গণতন্ত্রহীনতার মূল লক্ষণ হচ্ছে, আইনের শাসন থাকবে না। কর্তৃত্ববাদী যারা আছে, ক্ষমতাসীন যারা আছে, তারা যা খুশি তা করতে পারে। এসব করে আমি বেঁচেও যেতে পারি। যদি আমার কাছে দুটো জিনিস থাকে। একটা হচ্ছে, টাকা যদি থাকে অথবা আমি যদি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পারি। অন্য একটা ঘটনার কথা বলি। কিছুদিন আগে এক এমপির ছেলে ট্রাফিক জ্যামে পড়ে খুব বিরক্ত বোধ করলো, বিরক্তবোধ আমরাও করি। অবশ্য আমাদের হাতে লাইসেন্স করা পিস্তলও নেই। থাকলেও ওইটা ব্যবহার করার মতো মন মানসিকতাও থাকতো না অথবা সাহসও থাকতো না। কারণ আমি জানি, ওটা করলে আমার জেল-ফাঁসি হবে। এখন সে বিরক্ত হয়ে গুলি করে মানুষ মেরে ফেলল। এই মানসিকতা তৈরি হয়েছে কোথা থেকে? সে ভাবলো, আমি বিরাট ক্ষমতাসীন ব্যক্তির সন্তান। ক্ষমতা ব্যবহার করে যেকোন জায়গায় পার পেয়ে যাওয়া যায়। ফলে, সে এটা করতে সাহস করেছে। রাজন হত্যার ক্ষেত্রেও আমরা তা দেখি। যদিও সে এরেস্ট হয়েছে। শেষপর্যন্ত কী হবে না হবে, তা তো আমরা দেশবাসী জানতে পারবো না। মিডিয়াও সেটা আর ফলোআপ করবে না। এই মানসিকতা তৈরি হয়েছে এ কারণে, দেশে আইনের শাসন নাই। ক্ষমতার দাপট চলছে। এই জায়গা থেকে পুরো পরিবেশটা এভাবে তৈরি হয়েছে। রাজনের ক্ষেত্রে আমরা কী দেখেছি? তাকে শুধু অত্যাচার করেনি। সেটার ছবি তোলে আবার ফেসবুকে দিয়েছে। এটা এক ধরনের প্রদর্শনবাদিতা। সে যে ক্ষমতাসীন যা খুশি তা করতে পারে। টাকা থাকলে যা হয়, প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ধরে পার পেয়ে যাবো। মূলত সার্বিকভাবে রাজনৈতিক শূন্যতা, গণতন্ত্রহীনতা এবং তার সঙ্গে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি বিরাজ করছে।
প্রশ্ন : মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরবর্তীতে পরীক্ষা বাতিলের দাবি নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা নিয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
রনো : এখানে ব্যাপারটা হচ্ছে, শিক্ষাকে আসলে বাণিজ্যিক বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। শিক্ষা এখন আর জ্ঞান চর্চার বিষয় না। বলা হচ্ছে শিক্ষা অধিকার। অধিকার কার? যার টাকা আছে তার অধিকার। এমনকি ভ্যাট তোলার পরও যে কয়েখ লাখ টাকা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দিতে হয় তা সাধারণের সাধ্যের বাইরে। এটার সঙ্গে জড়িত প্রাইভেটাইজেশন, বণিজ্যিকীকরণ এবং দুর্নীতি। শিক্ষাকে আমরা মহৎ কোন কিছু হিসেবে দেখছি না। যতীন সরকার একটা বক্তৃতায় বলেছিলেন, যেখানে ছাত্র ভর্তির নামে যে প্রতিষ্ঠান লাখ টাকা ডোনেশনের নামে ঘুষ নেয়, তারা তো নীতি নৈতিকতার ধার ধারবে না। এই যখন অবস্থা হবে তখন দুর্নীতিটা হবে। দুর্নীতিটা কোন পর্যায়ে গেছে যে মেডিকেলের এবার ভর্তির প্রশ্ন ফাঁস তো হলোই, আবার প্রশ্নের উত্তরও পরীক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে অভিনব কৌশলে। এটা শুনে আমি তাজ্জব বনে গেছি! যারা এখান থেকে পাশ বেরুবে সেই ডাক্তারের ওপর কতটা আস্থা রাখা যাবে তা চিন্তার বিষয়। মেধাবী ছাত্ররা বাদ পড়ে যাচ্ছে আবার অনেকে এতবেশি মার্কস পাচ্ছে যেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। শিক্ষাক্ষেত্রে সামগ্রিক যে অরাজকতা চলছে। সবমিলিয়ে লেজগোবরে অবস্থা এবং এটা সামগ্রিক অবস্থার একটা অংশ। আমি কোনটাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছি না। এর মূল জায়গা হচ্ছে, একটা স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় আছে। আমি শুধু আওয়ামী লীগের কথা বলছি না। বিএনপির আমলে তেমনটা ছিলো। ক্রমাগত এটা বাড়ছে। ভবিষ্যতে কখনো বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দেখা যাবে আরেক ডিগ্রি উপরে নিয়ে যাবে।
প্রশ্ন : আপনারা অনেকদিন ধরেই বাম-গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যের কথা বলছেন। কিন্তু তেমন ঐক্য বা কর্মসূচি কিছু এখনো দেখছি না কেন?
রনো : প্রথমত ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আমরা দেখেছি তা হলো একবার এই দল, আরেকবার ঐ দল পালাক্রমে ক্ষমতায় আসছে। দু দলেরই কিছু নির্দিষ্ট ভোটার আছে যার সংখ্যা ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। কিন্তু যখনই একদলকে পছন্দ হচ্ছে না, তখন তার বদলে আরেকদলকে বসাচ্ছে। এভাবেই পালক্রমে ক্ষমতা বদল হয়ে আসছিলো। এর বাইরে জনগণ খুব একটা চিন্তা করেনি। আমরা যারা আছি তারা তেমন দৃশ্যমান না। এটা সত্যি কথা। এখন যদি নির্বাচন হয়, এবার তো হলো বিএনপির টার্ম। মানে, আগের নিয়ম অনুসারে। আমার ধারণা, এখন নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। হয়তো বিকল্প হিসেবে বিএনপি চলে আসবে, আবার মানুষ হতাশ হবে। সেখানে উচিত এ দুটির বিকল্প হিসেবে একটা শক্তিকে সামনে নিয়ে আসা। সে শক্তি আবশ্যিকভাবে পূর্ণ বাম হবে তা নয়। বাম অবশ্যই তার অংশ হবে। বাম-গণতান্ত্রিক-উদার চিন্তা সম্পন্ন দেশপ্রেমিক একটা শক্তি। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি এরা বাম তো নয়ই, আবার উদার চিন্তা ভাবনারও লোক নয়। এরা গণতান্ত্রিক বা দেশপ্রেমিকও নয়। তাই এমন একটি শক্তি প্রয়োজন তার মধ্যে নানান ধরনের লোক থাকতে পারে। সব যে একেবারে নিখাদ হবে তা নয়। তবুও একটা বিকল্প দাঁড় করানো দরকার। সেটা যদি দাঁড় করানো যায় এবং সেটা যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রমাণিত করতে পারে। আমার ধারণা সেটা জনগণ সেটাকে বেছে নিবে। কিন্তু সেরকম হচ্ছে না। তার অনেক কারণ আছে। এটাতে আমাদেরও কিছু দুর্বলতা আছে। নানান ধরনের লোককে একসঙ্গে নিয়ে বসা এটা বেশ কঠিন কাজও বটে। কিন্তু সেটা করতে হবে। হোমওয়ার্কটা করতে হবে। শুধু হোমওয়ার্ক না, ফিল্ড ওয়ার্কও করতে হবে। রাস্তায় নামতে হবে। যেমন কমিউনিস্ট পার্টি আর বাসদ তো নেমেছে গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রতিবাদে। দাঁড়িয়ে মারও খেলাম। পুলিশ শুধু না, আওয়ামী লীগের লোকজনও হামলা করেছে। এরকম মারটার খেয়েই তো দাঁড়াতে হবে। এভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে যদি দাঁড়াতে পারি। আরও সকলকে যদি নিতে পারি যারা কিছুটা পরিমাণে গণতান্ত্রিক, কিছুটা পরিমাণে দেশপ্রেমিক অন্তত। তাহলে আমার মনে হয় মানুষ এগিয়ে আসবে।
প্রশ্ন : সরকারি কর্মচারীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। ২১ লাখ সরকার বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?
রনো : এটা ট্রিকি প্রশ্ন বটে। যেটা হচ্ছে সরকারি কর্মচারীরা যে বেতন আগে পাচ্ছিল সে বেতনটা যথেষ্ঠ নয় আরো বাড়ানো দরকার। একই কথা শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শ্রমিকদের বেতন বাড়লেও একই কথা উঠবে। কিন্তু এভাবে দেখাটা ঠিক না। সত্যি কথা হলো, শুধু বেতন বাড়াটাই যথেষ্ঠ না। সামগ্রিক সবারই আয়ের পথ বাড়াতে হবে। এর মধ্যে নিুবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যাই বেশি। এদের ইনকামও বাড়াতে হবে। এটা একটা সামগ্রিক বিষয়। আমাদের এখানে ঘটনাটা হচ্ছে, সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়াচ্ছে কারণ তাদেরকে খুশি রাখতে হবে। তার প্রশাসন ঠিক রাখার জন্য। শ্রমিকের বেতন সরকার সহজে বাড়াতে চায় না। তবুও অনেক সময় বাড়ায় কারণ তারা একটা সংঘবদ্ধ শক্তি। যারা সংঘবদ্ধ নয় তাদের যা খুশি হোক। এটা ঠিক না। বেতন বৃদ্ধিকে আমি খারাপ চোখে দেখছি না। বাজার দর অনুসারে তাকে এটা দেয়া দরকার। মূলত পুরো জিনিসটার সমাধান করতে হবে এমন একটা ইকোনোমিক পলিসির মাধ্যমে যেখানে দরিদ্র জনগণের আয়-রোজগার বা বেতন বৃদ্ধি পায়। যারা খুব উচ্চ আয়ের মানুষ, তাদের কাছে খুব উচ্চ ভ্যাট আরোপ করে এটা হতে পারে। আরো নানা রকম পন্থা আছে। সরকার মূলত ধনীক তোষণ নীতি অনুসরণ করছে। আর তাদের প্রশাসনকে ঠিক রাখার জন্য এবং পুলিশ, আর্মি এবং বুরোক্রেসিকে খুশি রাখার জন্য বেতন বৃদ্ধি ছাড়াও ক্ষমতা বা দাপটের মতো নানা রকম নন-ইকোনমিক সুবিধা দিচ্ছে। এটা হচ্ছে এন্টি পিপল সরকারের সাধারণ পলিসি। কিন্তু বেতনভূক কর্মচারিরা বেতন যে বৃদ্ধি পেয়েছে আমি তার বিরুদ্ধে না। কিন্তু টোটাল ইকোনোমির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমনভাবে করা হোক যাতে সবার আয়-রোজগার বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্নœ : খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক লন্ডন সফর বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য নতুন কোন ইঙ্গিত দিচ্ছে কী?
রনো : এটা আমি খুব একটা বলতে পারবো না। হতে পারে তার ছেলের সঙ্গে আলোচনা করতে গেছে। টেলিফোনে যেটা করতে পারবে না। সেটা আবার রেকর্ড হয়ে যাবে। হতে পারে মুখোমুখি কথা বলা দরকার। সেটা তার রাজনীতির লাইনে কোন পরিবর্তন আনবে কী আনবে না। সেটা বলা যাচ্ছে না। দুটো জিনিস হতে পারে। মা-ছেলের স্বাভাবিক দেখা হতে পারে। সঙ্গে রাজনীতির ব্যাপারটা নিশ্চয় আলোচনা করবে তারা। সেটা কোনদিকে যাবে আমি তো বলতে পারবো না। দেখা যাক।
সাক্ষাতকার গ্রহণ : হাসনাত শোয়েব

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে