কারাবাসের পঞ্চম দিন, দ্রুত সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা বিএনপির ফাঁদে সরকার

খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীনদের পাতা কোনো ফাঁদে পা দেয়নি বিএনপি। তাই চেয়ারপারসনের কারাবাসের পাঁচ দিনেও দলটি সংযত ও স্থির রয়েছে। কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে দলটি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন রাজনৈতিক মহল।

গত বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। একইসঙ্গে এ মামলার অন্যতম পলাতক আসামি খালেদাপুত্র তারেক রহমানসহ আরও ৫ জনের ১০ বছর করে কারা ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এ অবস্থায় বিএনপির মতো বৃহৎ দলটি মহাসংকটে পড়লেও দ্রুত সে সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংকট মোকাবেলা করছে বিএনপি। এমন সংকটপূর্ণ সময়ে দলটি উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। এটি একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক দলের আচরণ।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, সরকার খালেদার দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি ফাঁদ পেতেছিল। যার কোনোটিতেই বিএনপি পা দেয়নি। সরকার চেয়েছে- মামলার রায়ের পর বিএনপিকর্মীরা বেপরোয়া প্রতিক্রিয়া দেখাক। অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে সহিংস পথ বেছে নিক। বিএনপি কর্মীরা সে পথ বেছে নিলে সরকার বিভিন্ন মামলা দিয়ে অবশিষ্ট নেতাকর্মীদেরও গ্রেপ্তার করতে পারে।

বিশেষ করে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াতের সহিংস কর্মসূচি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বিএনপিকে। সেবারের আত্মঘাতী কর্মসূচির পর বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মামলায় কারান্তরীণ করা হয়েছে। অনেকে গুম-খুনের শিকারও হয়েছেন। ২০১৪ এর ঘটনার পর জনগণ থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিল বিএনপি। সরকারও নানা কৌশলে-প্রচার প্রচারণা দিয়ে এ দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিএনপির অবিমৃষ্যকারিতার কারণেই একটি একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচন দিয়েও টিকে গেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার।

অনেকের ধারণা, ২০১৪-এ ঠেকে শিখেছে বিএনপি। কঠিন কর্মসূচি দিয়ে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে নরম কর্মসূচি দিয়ে জনগণের মাঝে টিকে থাকাটাই এই মুহূর্তে বিএনপির কৌশল। কারণ কঠিন কর্মসূচি দিয়ে, মাঠে-ময়দানে গরম গরম কথা বলে গত কয়েক বছরে কোনো ফল ঘরে তুলতে পারেনি বিএনপি। উপরন্তু হিতে বিপরীত ঘটেছে। সর্বশেষ খালেদার মামলাকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন নেতারা।

মামলার রায়ের দিন সারা দেশে অবস্থান ও কঠিন কর্মসূচির ঘোষণা আবারও কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের জন্য। রায়ের আগে-পরে বিএনপির সহস্রাধিক নেতাকর্মী আটক হয়েছেন। তাদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অনেকটা নেতাশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে বিএনপিও চায়নি খালেদার মামলার রায়ের পর বড় ধরনের কোনো আন্দোলন দিয়ে বাইরে থাকা অবশিষ্ট নেতাকর্মীদের ঝুঁকির মুখে ফেলতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির মূল লক্ষ্য এখন আগামী জাতীয় নির্বাচন। সে লক্ষ্যে ঠান্ডা মাথায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে চায় তারা। সহিংস কর্মসূচির জন্য সরকার যতই উসকানি দিক, সে ফাঁদে পা না দিয়ে লক্ষ্যে অটুট থেকে দলকে গোছানোর কাজেই মনোযোগ দিয়েছে বিএনপি।

বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, কারান্তরীণ হলেও চেয়ারপারসনের নির্দেশনার ভিত্তিতেই কঠোর কোনো কর্মসূচি নেয়নি বিএনপি। তার নির্দেশ মোতাবেক দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী ধৈর্য ধরেছেন এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। কোনো প্ররোচনাতেই বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন আইন হাতে তুলে নেবেন না। এ নির্দেশ শুধু কেন্দ্র নয় তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

দলের আরেকটি সূত্র বলছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনের মাঠ আওয়ামী লীগকে ছেড়ে দেবে না বিএনপি। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিকে জোরদার করতে আন্দোলনের বিকল্প নেই। এখনই দলের শক্তি ক্ষয় না করে নির্বাচনের সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে বিএনপি। রায়কে ঘিরে কঠিন কোনো কর্মসূচি দিলে সরকার হার্ডলাইনে যাবে, সারা দেশে নেতাকর্মীদের আবারও ধরপাকড় করবে। এখন গ্রেপ্তার হলে সহজে জামিন হওয়ার সম্ভাবনাও কম। তাই দলটি আপাতত এক পা পেছনে গিয়ে দলের অভ্যন্তরে ঐক্য ও শক্তি সঞ্চয় করছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, নেত্রীর নির্দেশমতো আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি। তাই বড় কোনো কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। এটা এই মুহূর্তে আমাদের রাজনৈতিক কৌশল। তবে বেগম জিয়ার আদালতে যাওয়ার সময় মানুষের যে ঢল ছিল তাতেই বোঝা যায়, বড় যে কোনো আন্দোলনের জন্য মানুষ প্রস্তুত। কিন্তু আমরা এখনই সে কর্মসূচি দেব না।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আগামী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার আদালতকে ব্যবহার করেছে। এ মামলা আমরা আইনি এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবেলা করব। পরিবর্তন

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে