জাপানের ফুল প্রেমিকদের স্বর্গ

আমরা জাপানের যে প্রিফেকচারে (Prefecture) বাস করি সেটার নাম তোত্তরি (Tottori) প্রিফেকচার। জাপানের বর্ণমালায় টি (T) না থাকায় জাপানিদের উচ্চারণে বললে বলতে হয় তোত্তরি। মেইন আইল্যান্ড হোনসুতে এটার অবস্থান। বাংলাদেশিদের কাছে জাপানের পরিচিত শহর ওসাকা, কোবে, হিরোশিমা তোত্তরির তিন দিকে অবস্থিত। অন্য দিকটা জাপান সাগর দিয়ে ঘেরা। ওসাকা থেকে এখানে আসতে ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা বাসে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগে—হাইওয়ে ব্যবহার করলে।

ওসামা বা টোকিওর মতো ব্যস্ততা নেই এই ছোট্ট শহরটিতে। ইউএসজে (Universal Studio Japan) কিংবা টোকিওর ডিজনিল্যান্ডের মতো amusement পার্ক না থাকলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এ অঞ্চলটি। ডাউন টাউন থেকে ১৫ মিনিট ড্রাইভ করলেই দেখা হবে জাপান সাগরের নীল পানির। জুলাই মাসের তৃতীয় সোমবার উমি নো হি নামে সরকারি ছুটির দিন থেকে সমুদ্রটাকে উন্মুক্ত করা হয় সবার জন্য। কাজ পাগল মানুষগুলোও পরিবার নিয়ে সারাদিন রোদে পোড়ার জন্য সমুদ্রের পাড়ে টেন্ট গাড়ে।

সাগরে সাঁতার কেটে ক্লান্ত হয়ে পোড়া মাংস খেয়ে রেস্ট নিয়ে আবার নেমে পড়ে সমুদ্রে। কেউবা আবার ওয়াটার স্পোর্টসকে উপভোগ করে। অফ সিজনে সমুদ্রের ধারে বসে সূর্যাস্তের দৃশ্যটা দেখলে সারাদিনের ধকলকে ভুলে যাওয়া যায় এক মুহূর্তে। অন্ধকারটা বাড়তে থাকলে কোস্ট গার্ডের লাইটগুলো জ্বলজ্বল করতে থাকে একটু দূরেই। মাছ ধরা ট্রলারগুলোর মৃদু আলোও চোখে পরে একটু পর পর। সমুদ্রের ডাক ছাড়া নেই কোন শব্দ। সুনামির ভয় না থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু সিটি সার্ভিস, লাইট, খাবার পানির ব্যবস্থা এগুলো বন্ধ হয়ে যায় রাত নটার পর। এরপর সাগর পাড়ে থাকার নিয়ম নেই। পুলিশের উপদ্রব শুরু হয় তার পরেই। তাঁদের প্রশ্নবান থেকে বাঁচতে চাইলে আগে আগেই ভেগে পড়া ভালো।


সূর্যাস্তের দৃশ্য

ঘর থেকে বের হলেই চোখে পড়বে ছোট বড় অনেক পাহাড়। পাহাড়গুলোকে এই অঞ্চলটির প্রাচীরের সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে না। চার ঋতুতে চার রং ধারণ করে পাহাড়গুলো। শীতে তুষারে ঢাকা পাহাড়গুলো বসন্তে সবুজে ঢেকে যায়। শরতে আবার মাল্টিকালার ধারণ করে। শহরের অদূরেই সারি সারি আবাদি জমি, তরমুজের খেত, নাসপাতির বাগান। লোকজনদের নেই কোনো ব্যস্ততা। ইলেকট্রিক ট্রেন এখনো আসেনি এই অঞ্চলে, তাই বুলেট ট্রেনটাও ছোটাছুটি করে না এখানে।


গ্রীষ্মকালে মরুভূমিতে মানুষের ভিড়

গ্রীষ্মকালে অবসর পেলেই এ অঞ্চলের মানুষগুলো ছুটে যায় Tottori Sand Dune নামক এখানকার ছোট্ট মরুভূমিতে। শুধু এই অঞ্চলের নয়, দূর দূরান্তের মানুষগুলোও ভিড় জমায় এখানটাতে। উটের পিঠে চড়ে ১০-১৫ মিনিট ঘুরে থ্রিল নেয় মরুভূমিতে ভ্রমণের। Sand hill, সমুদ্র, বালুচরকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে, উটের পিঠে চড়ে, স্যুভেনির ছবি নিয়ে কিছু সময়ের জন্য ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যস্ততাটাকে। সমুদ্র, dune ও সান সেটের বিখ্যাত শটটি ধারণ করার জন্য, ক্যামেরা হাতে প্রফেশনাল থেকে শুরু করে অ্যামেচার ফটোগ্রাফার পর্যন্ত তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে একটা পরিষ্কার আকাশের।
তুষারের সিজনে ওরা ছুটে যায় মাউন্ট দাইসেনের (এই অঞ্চলের উঁচু পাহাড়) পাদদেশে। স্কি করে শীতকালেও ঘাম ঝরায় শরীর থেকে।

শীতের প্রকোপ শেষ হলেই এরা বেরিয়ে পরে ফুল দেখতে। হানা কায়রে হলো আর্টিফিশিয়াল ফ্লাওয়ার গার্ডেন। ছোট পাহাড়ের চূড়ায় পরিত্যক্ত জায়গাগুলোকে ব্যবহার করে বানানো হয়েছে এই বাগানটি। সিজনাল ফুল থেকে শুরু করে দেশি বিদেশি ভ্যারাইটি ফুলের চাষ হয় এখানে। বন্ধের দিনগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পরে স্থানীয় লোকগুলোর সঙ্গে দুরের প্রিফেকচারের লোকগুলোও। ফুল প্রেমিকদের জন্য ওটা একটা স্বর্গ।

 

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে