পশ্চিমা সাহিত্যতত্ত্বের তোতাপাখি না হয়ে স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনার বিস্তারই আকাঙ্ক্ষিত-মুহম্মদ নূরুল হুদা

 

 

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা’র জন্ম ১৯৪৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের ঈদগাঁও পোকখালী গ্রামে। পিতা হাজী মুহাম্মদ সেকান্দর ও মা আনজুমান আরা বেগম। ঈদগাঁও হাইস্কুল থেকে ১৯৬৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডের মানবিক বিভাগে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন ১৯৬৭ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স এবং ১৯৭১ সালে এমএ পাস করেন। কর্মজীবনে তিনি অধ্যাপনা, বাংলা একাডেমি এবং নজরুল ইন্সটিটিউটের সাথে যুক্ত ছিলেন। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বাংলা একাডেমি পুরস্কার ছাড়াও একুশে পদক, কবি আহসান হাবীব কবিতা পুরস্কার, আলাওল পুরস্কার, সুকান্ত পুরস্কার, কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

-আপনার প্রথম প্রকাশিত বইয়ের অনুভূতি জানাবেন?
মুহম্মদ নূরুল হুদা : যতক্ষণ প্রকাশিত হয়নি, ততক্ষণ খুব মউজে ছিলাম, উত্তেজিত ছিলাম। কিন্তু ছাপা-বাঁধাই হয়ে বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন চুপসে গেলাম। হ্যান্ডকম্পোজ, প্রগতি টাইপে ছাপা। কভারে ত্রিভূজ মটিফে আঁকা নৃত্যপরায়ণ জ্যামিতিক রমণী। গ্রন্থের নাম : ‘শোনিতে সমুদ্রপাত’। বেশ কয়েক দফা বদল হয়েছে কবিতার নির্বাচন ও গ্রন্থের নাম। নিজে পড়ে নিজেকেই কেমন বোকা বোকা মনে হতে লাগল। তবু তো নিজেরই শব্দশিশু। কী আর করা। যতক্ষণ পারা যেতো, বুকে জড়িয়ে রাখতাম। কাঁধের ঝোলাতেও এমনভাবে রাখতাম, যেন যে-কেউ সহজেই দেখে ফেলে। ষাটদশকের অনেক কবিই দীর্ঘদিন নির্গ্রন্থ সন্ন্যাসী ছিলেন। আমি অনেকেরই আগে এই অপবাদ থেকে মুক্তি পেলাম। তাই নিজেকে বেশ হাল্কাও মনে হচ্ছিল।

-বারবার পড়তে ইচ্ছে হয়, এমন কোনো বই এবং সে বই হাতে পাওয়ার গল্পটি বলবেন?
হুদা : অবশ্যই জীবনানন্দ দাশের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ভারবি প্রকাশিত। নিউমার্কেটের নলেজ হোম থেকে বইটি কেনার পর কতবার যে পড়েছি কতভাবে, দিনে বা রাতে, হিসাব করে দেখিনি। কিছু কি বুঝেছি? জানি না, তবে তেমন কিছু বুঝতেও চাইনি। শুধু পড়েছি আর পড়তে পড়তে নিজের অতৃপ্তি বাড়িয়েছি। তারপর নিজে লিখতে বসেছি। ১৯৬৬ সালের এক বিনিদ্র রজনীতে ঢাকা কলেজের নর্থ হস্টেলের ৩১৬নং রুমে শুয়ে-বসে নানাভাবে এই বই পড়েছিলাম আর একে একে ২৫টি নতুন কবিতার খসড়া করেছিলাম। তবে এগুলোর একটিও ছাপিনি। স্কলারশিপের টাকায় কিনেছিলাম বইটি, দীর্ঘদিন আমার রাখাইন ঝোলায় ছিল। ১৯৭১ সালে মহসিন হল ছাড়ার পর অন্য অনেক কিছুর মতো এই বইটিও হারিয়ে গেছে। আর খুঁজে পাইনি। অন্য সংস্করণের বইতে কেন যেন মন ভরে না।

-দীর্ঘ পাঁচ দশকের সৃষ্টিশীল যাপনে সাহিত্যের আঙ্গিকের কোনো কোনো পরিবর্তনকে আপনি ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করবেন?
হুদা : চর্চা ও চর্চাকারী বেড়েছে, পাঠ ও পাঠকারী বেড়ছে, তবে আসল বোদ্ধা বেড়েছে কিনা সন্দেহ। কবিতার আঙ্গিক বিচিত্র পথে এগিয়েছে, উপন্যাস জনপ্রিয়তা পেয়েছে, গল্প মনোলীন হয়ে উঠেছে, প্রবন্ধ ইত্যাদি মননশীলতার চাষাবাদও বেড়েছে। মজার কথা, সাহিত্যচর্চা ও কবিতা লেখা সমাজে আদরনীয় হয়ে উঠেছে। মন্ত্রী, আমলা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানীও কবি হতে পারলে খুশি হয়। তবে সচেতন, পাঠনির্ভর, স্বাতন্ত্র্যসন্ধানী সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে অঙ্গলিমেয়।

-উত্তরাধুনিকতা চর্চার কথা বলা হচ্ছে। যারা এর দাবিদার তাদের অনেককেই আধুনিকতার কাতারে ফেলা মুশকিল। আধুনিকতার ন্যূনতম শর্তই সামগ্রিকভাবে বিকশিত হয়নি, সেখানে উত্তরাধুনিকতার চর্চা সাধারণের মাঝে কী নিয়ে আসতে পারবে বলে আপনার মনে হয়?
হুদা : ওই যে বললাম সচেতনতা ও পাঠের অভাব। অবশ্যই সত্য যে আধুনিকতা না পেরিয়ে উত্তরাধুনিকতায় আসা যাবে না। উত্তরাধুনিকতা তো আধুনিকতারই সম্প্রসারিত, নবায়িত ও পরিবর্তিত রূপ। তাই উত্তরাধুনিকের আরেক নাম অব্যাহত আধুনিক বা কনটিনউয়াস মডার্ন। নিবিড় পাঠ ও সশ্রম অনুশীলন ছাড়া আধুনিক বা উত্তরাধুনিক কোনোটাই হওয়া যায় না। সামাজিক ও নান্দনিক পরিবেশের ভিন্নতার কারণে একেক দেশে আধুনিকতা বা উত্তরাধুনিকতার সংজ্ঞা বা বিস্তৃতি একেক রকম। পশ্চিম ও পুবের মধ্যে এসবের প্রাকরণিক, কাঠামোগত ও ঐতিহ্যিক ভিন্নতা বিদ্যমান। তাই পশ্চিমা সাহিত্যতত্ত্বের তোতাপাখি না হয়ে বরং স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনার বিস্তারই অধিকতর আকাক্সিক্ষত।

-পরিসংখ্যান বলছে, অনলাইনের প্রসারের কারণে লাইব্রেরি কমে যাচ্ছে। কমছে আড্ডাও। একটি জাতির সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
হুদা : সবকিছু ফ্যাশনদুরস্ত বলে মনে হচ্ছে। ভার্চুয়াল লাইব্রেরির পাশাপাশি অ্যাকচুয়াল লাইব্রেরিও থাকবেই থাকবে। যতদিন এই বস্তুশরীর থাকবে, ততদিন বস্তুচোখে পাঠযোগ্য বস্তুবইও থাকবে। সৃষ্টিশীলতা বা মননশীলতার জন্য তো বটে, এমনকি শীর্ষানন্দের স্বার্থেও বস্তুবই ও বস্তুপাঠাগার থাকবে।

-এখন কি দেখা হয়? আপনি কি একা হন? ‘দেখা হলে একা হয়ে যাই’ প্রেমিক হৃদয়ের চিরসত্য এই মহৎ পঙ্ক্তিটি লিখেছিলেন আজকের জাতিসত্তার কবি। সেই সময়ের প্রেমিক কবির কথা জানাবেন?
হুদা : দেখা তো হয়ই। একজনমে যেমন লাখো জন্ম, তেমনি এক দেখাও লাখোবারের দেখা। একা হওয়ার জন্যই দেখা। যদি একাই না হই, তবে দৃষ্টিশীল হই কী করে? যদি দৃষ্টিশীলই না হই, তবে সৃষ্টিশীল হই কী করে? সেই সময়ের তরুণ কবি লিখেছিলেন, ‘সত্তরেও থাকবো যুবক তোমার দেখা পেয়ে’। এখন সেই তরুণের বয়স সত্তরের দিকে ধাবমান। এখনও সে যুবক। প্রেমিক বুড়িয়ে যায় না, কবিও না।

 

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে