প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরূ : জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নারীর অবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। গত ছয় বছরে বাংলাদেশে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নে ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি ব্যুরোর জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশে সাড়ে ৫ কোটি শ্রমিক বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন। এর মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় পৌনে ২ কোটি। সরকারিভাবে বাংলাদেশের মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি’তে) নারীর অবদান ২০ শতাংশ। নারীরা যে গৃহস্থালি কাজ করেন তার অর্থমূল্য আনুমানিক আড়াই লাখ কোটি টাকা। সে হিসেবে জিডিপি’তে নারীর প্রকৃত অবদান হবে আরও অনেক বেশি।বাংলাদেশের নারীরা এখন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বিদেশে চাকুরি করতে উৎসাহী হচ্ছেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, গত ১০ বছরে পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শ্রমিকও বিভিন্ন পেশায় চাকুরি নিয়ে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বর্তমানে পৃথিবীর ১৬০টি দেশে প্রায় ১ কোটির কাছাকাছি বাংলাদেশি পুরুষ ও নারী শ্রমিক কাজ করছেন। দালালদের দৌরাত্ম্যে শ্রমিক প্রেরণে কিছুটা ভাটা পড়েছে। এ অবস্থার মধ্যেও পুরুষের তুলনায় নারীদের বিদেশে গমনের হার অনেক বেড়েছে। জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরোর জরিপে দেখা যায়, ২০১৩ সালে ৫৬,৪০০ জন নারী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন আর ২০১৪ সালে গেছেন ৭৬,০০৭ জন। গত ৬ বছরে নারীদের বিদেশে গমনের হার ছয় গুণ বেড়েছে। মাত্র ২০ হাজার টাকায় নারীরা এখন বিদেশে যেতে পারছেন। সরকারিভাবে বিদেশে যাওয়ার খরচ কম হওয়ায় নারী শ্রমিকরা উৎসাহী হচ্ছেন। এছাড়া আগের তুলনায় বর্তমানে নিরাপদে বিদেশে যাওয়ার নিয়মাবলী ও সুযোগ-সুবিধার প্রচারণার হার বাড়ার কারণে গ্রামীণ নারীদের বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ বাড়ছে।বিদেশে নারী শ্রমিকরা সাধারণত হাউজকিপার, গার্মেন্টকর্মী, মিডওয়াইফ, ডে কেয়ার কর্মী, নার্স, বেবি সিটার, বিউটিশিয়ান ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। তাই বিদেশে নারীদের কাজের চাহিদা অনুযায়ী ভালো প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে গেলে যেমন বেশি বেতন পাওয়া যায়, তেমনি কর্মক্ষেত্রে সম্ভব্য ঝুঁকি সহজে মোকাবেলা করা যায়। হাউজকিপার বা গৃহকর্মীর কাজে বিদেশে যেতে চাইলে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশত্যাগ করতে হবে যা সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক। তবে জনশক্তি ব্যুরোর আওতায় বিদেশগামী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের জন্য দেশে মোট ৩৮টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও নারীরা প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র ১৪টিতে। এটি একটি বৈষম্যমূলক অবস্থা।যে কোনো পেশায় কাজ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের বিপদের আশংঙ্কা অনেক বেশি। তারা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি অরক্ষিত ও অসহায় অবস্থায় থাকেন। ভাগ্যান্বেষণে দূরদেশে কাজ করতে গিয়ে পাচার কিংবা যৌন নির্যাতনের মতো বিশেষ পরিস্থিতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি কেবল নারীদেরই থাকে। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে নারীরা সঠিকপেশা নির্ধারণ এবং নিরাপদ বাসস্থান বা অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেন না। তাছাড়া নারী শ্রমিকরা অনেক সময় বিদেশে যাওয়ার আগে ঐ দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি বিচার না করেই অপরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ফলে তারা নানা সমস্যা ও প্রতারণার স্বীকার হন। এমনকি পাচারকারীর হাতে পড়েন অথবা যৌনকর্মীর মতো অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য হন।এ বছরে জানুয়ারী মাসে সৌদিআরবে পুণরায় শ্রমিক নিয়োগ বিষয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে আমারে সরকারের সমঝোতা হয়। ইতোমধ্যে শ্রমিক প্রেরণ বিষয়ে একটি মুক্তি হয়েছে। মুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে গৃহকর্মের পেশায় নারী শ্রমিকরা যাবেন বলে নিবন্ধন করা হয়েছে। তবে নারীদের মধ্যে সৌদি আরবে যাওয়ার ব্যাপারে তেমন একটা উৎসাহ দেখা যায়নি। কারণ হিসেবে দেখা যায় এ পেশায় বেতন কম ও নানবিধ নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের দেশের নারীদের গৃহকর্মের ভিসায় বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ স্থগিত করেছেন। তাদের মতে, গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। আর সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। অন্যান্য পেশার তুলনায় গৃহকর্মী নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক রিপোর্টে জানা যায়, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা বেশ কিছু নারী শ্রমিকের ওপর ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা একটি স্টাডি রিপোর্টে করেছেন। তাতে দেখা যায়, প্রতি ৩ জনে ২ জন অভিবাসী নারী শ্রমিক তাদের নিয়োগকর্তা দ্বারা কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বেশি। বিদেশে কম-বেশি প্রায় সব পেশায় নারী শ্রমিকরা নির্যাতনের শিকার হন। তবে যারা গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তারা বেশি মাত্রায় শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। গৃহকর্মে অন্তরীণ পরিবেশ থাকার কারণে নির্যাতনের অনেক ঘটনা প্রকাশিত হয় না। নিরুপায় নারী শ্রমিকরা সব অন্যায় সহ্য করতে বাধ্য হন। নারী শ্রমিকদের বিদেশে কর্মক্ষেত্রে নানাবিধ হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অন্যতম কারণ তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব ও জীবন দক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ না থাকা। অন্যদিকে এজেন্সি, লেবার উইং ও দূতাবাসমূহের উদাসীনতার কারণেও অনেক নারী শ্রমিক নির্যাতনের শিকান হন। নির্যাতিত নারীদের মতে, বিপদের সময় এজেন্সি ও দূতাবাসমূহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার ফলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। শুধু বিদেশে নয় দেশে ফিরে আসার পরও একজন নারী শ্রমিককে প্রায়ই সমাজে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে যারা প্রতারিত হয়ে ফিরে আসে তাদের নিয়ে সমাজে অনেকেই উপহাস ও বিদ্রুপ করে। আবার কারও আর্থিক উন্নতি দেখলে বলা হয় অবৈধ পথে টাকা আয় করেছে। যারা অসুস্থ হয়ে ফেরত আসেন তাদের সম্পর্কেও সমাজে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়। এ ধরনের ঘটনা একজন নারীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়। সামাজিকভাবেও তিনি হন হেয়প্রতিপন্ন। তাই যারা পরিবার ও দেশের জন্য এত ত্যাগ শিকার করে রেমিটেন্স পাঠান তাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই এগিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই নারী শ্রমিকরা নিরাপদে বিদেশে যাবেন। সেখানে ভালো কর্মপরিবেশ এবং সম্মান ও নিরাপত্তা পাবেন। চাকুরি  শেষে তারা দেশে ফিরে সমাজের উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিবেন। পেশাগত দক্ষতার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি ভাষা জ্ঞান ও জীবন দক্ষতার ওপর  প্রশিক্ষণ নিলে বিভিন্ন পরিবর্তনশীল অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলা সহজ হয়। গৃহকর্ম ভিসায় নারীদের নিয়োগদানের আগে সম্ভব হলে এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগকর্তা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে। চুক্তির সাথে সামাঞ্জস্য রেখে তাদের জন্য কর্মঘণ্টা ও বেতন পর্যালোচনা করা উচিত। পাশাপাশি সব কর্মীর জরুরি প্রয়োজনে সাড়া দিতে এজেন্সি, লেবার উইং ও দূতাবাসগুলোকে আরও আন্তরিক হয়ে সেবা দিতে হবে। নির্যাতনের ঘটনা যে সব দেশে বেশি, সে সব দেশের দূতাবাসে নারী কর্মকর্তা দ্বারা পরিচালিত শেল্টার হোমের ব্যবস্থা থাকা দরকার।দেশের সার্বিক উন্নয়ন তথা নারীর ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করতে বিদেশে নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে নারীবান্ধব নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা হলে নারীরা নিরাপদ ও নির্বিঘেœ কাজের সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যআয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশ ও বিদেশে নারী ও পুরুষের নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে ব্যক্তিস্বার্থ ও দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আরও ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করাতে হবে আমাদের সবাইকে।  পিআইবি ইউনিসেফ ফিচার

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে