মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিক, কেউ আটক হচ্ছেন কেউ নিখোঁজ

বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের চতুর্থ বৃহত্ উৎস দেশ মালয়েশিয়া

ডেস্ক রিপোর্ট :

বাংলাদেশী শ্রমিকদের বৈদেশিক শ্রমবাজারের অন্যতম গন্তব্য মালয়েশিয়া। রেমিট্যান্সেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস দেশটি। তবে অবৈধ উপায়ে মালয়েশিয়ায় গিয়ে আটক হচ্ছেন অনেকেই। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণেও আটক হচ্ছেন কেউ কেউ। চাকরি নিয়ে মালয়েশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজের ঘটনাও ঘটছে। আটক ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বাড়ছে আবেদনের সংখ্যা।

মালয়েশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের একজন কক্সবাজার জেলার টেকনাফের নয়াপাড়া গ্রামের মাসুম উদ্দিন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নিখোঁজ হন তিনি। এর এক মাস পর জানা যায়, তাকে অপহরণ করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয়া হলে এক বছর পর ছাড়া পান তিনি। মুক্তি পেয়ে মালয়েশিয়ার জোহোর বাহারু শহরের গেলাং পাতাহ এলাকায় একটি বস্ত্রবিতানে কাজ নেন মাসুম উদ্দিন। ২০১৬ সালের জুন থেকে আবারো নিখোঁজ হন তিনি। ১০ মাসেও খোঁজ না পাওয়ায় গত ২০ ফেব্রুয়ারি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেছেন মাসুম উদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা।

যোগাযোগ করা হলে মাসুম উদ্দিনের মামা সৈয়দ রেজা পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপহূত হওয়ায় মাসুম উদ্দিনের কাছে কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল না। এজন্য সে মালয়েশিয়া সরকারের সাধারণ ক্ষমা নিয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু হঠাত্ করেই আবারো নিখোঁজ হয়ে যায়। তার সেলফোন নাম্বারে ফোন দিলে অজ্ঞাত কেউ মালয় ভাষায় জবাব দিচ্ছে। নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেছি। এলাকায় আরো অনেকেই এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন।’

বৈধ পথে মালয়েশিয়া গিয়ে ভিসার মেয়াদ না বাড়ানোয় অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশী শ্রমিক। তারা বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়ে বন্দি রয়েছেন মালয়েশিয়ার জেলে। এমনই একজন কুমিল্লা জেলার রিয়াদ প্রধান (পাসপোর্ট নং এএফ১০৮১০৫৪)। তিন বছর তিনি কুয়ালালামপুর ও মালাক্কায় নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। তবে ভিসা নবায়ন করতে না পারায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে মালাক্কা থেকে গ্রেফতার করে মালয় ইমিগ্র্যান্ট পুলিশ। সরকারি ব্যবস্থায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেছেন রিয়াদের বড় ভাই মো. আসাদুজ্জামান।

যোগাযোগ করা হলে আসাদুজ্জামান গতকাল বলেন, ‘শুনেছি তার (রিয়াদ) কয়েক মাসের জেল হতে পারে। সরকার যদি সাজা মওকুফের জন্য দূতাবাস থেকে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’

রিয়াদ প্রধানের ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে চিঠি পাঠায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। বোর্ডের পরিচালক (অর্থ ও কল্যাণ) মো. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে রিয়াদ প্রধানকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শ্রম কাউন্সেলরকে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে গত মাসে একবার যোগাযোগ করা হলেও এর পর তার আর কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) জাবেদ আহমেদ বলেন, দেশের অফিসগুলোয় যেভাবে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ থাকে, অন্য দেশের অফিসগুলোয় তা থাকে না। আবার ভুক্তভোগীরা দেশের অফিসগুলোয় যেভাবে সহজেই আসতে পারেন, দূতাবাসে সেটা সম্ভব হয় না। এসব কারণে সমস্যার দ্রুত সমাধান অনেক সময় সম্ভব হয় না। এছাড়া বেশকিছু দেশের দূতাবাসে প্রয়োজনের তুলনায় জনবলস্বল্পতা রয়েছে। সে কারণেও অনেক সময় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা যায় না। অনেক সময় বাইরের দেশগুলোও দ্রুত সহযোগিতা করতে অনীহা প্রকাশ করে।

সমস্যার সমাধানে দীর্ঘসূত্রতায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার জহরবার জেলার কুলাঙ্গ জেলখানায় আটক রয়েছেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ফিরোজ আহম্মেদ (পাসপোর্ট নং এডি-৬৪৭৪৬৮০)। মালয়েশিয়ায় চাকরিরত অবস্থায় গত বছর ২৮ ডিসেম্বর গ্রেফতার হন তিনি। ছেলেকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদন জানিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেন ফিরোজ আহম্মেদের বাবা মো. সাহেব আলী। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মালয়েশিয়ায় অবস্থানের কারণে পুলিশ তাকে (ফিরোজ) গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছে। এ অবস্থায় ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে তিনি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের হস্তক্ষেপ চান।

আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে চিঠি পাঠায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। বোর্ডের পরিচালক নুরুন আখতার (আইআরপি) স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ফিরোজ আহম্মেদকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে শ্রম কাউন্সেলরকে নির্দেশ দেয়া হয়। যদিও এ পর্যন্ত বিষয়টি সমাধান হয়নি।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের চতুর্থ বৃহত্ উৎস দেশ মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স আসে ১৩৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসেছিল ১৩৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০৬ কোটি ৪৬ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৯৯ কোটি ৭৪ লাখ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৮৪ কোটি ৭৪ লাখ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে ৭০ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। আর চলতি অর্থবছরের সাত মাসে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৭ কোটি ২৬ লাখ ডলার।

২০০৭ ও ২০০৮ সালে ব্যাপক হারে বাংলাদেশী শ্রমিক দেশটিতে যান। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, ওই দুই বছরে দেশটিতে পাঠানো হয় ৪ লাখ ৪ হাজার ৯৬৩ শ্রমিক। এর পর থেকেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ধস নামে। ২০০৯ সাল থেকে অন্যতম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালে ‘জিটুজি’ পদ্ধতিতে আবারো বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিতে শুরু করে দেশটি। সে প্রক্রিয়া যথেষ্ট কার্যকর না হওয়ায় পরে মালয়েশিয়া সরকার পাঁচটি খাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ে ‘জিটুজি প্লাস’ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে রাজি হয়। চলতি মাসেই শুরু হচ্ছে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক রফতানি। মালয়েশিয়া থেকে সত্যায়িত হয়ে এরই মধ্যে নয় হাজার চাহিদাপত্র এসেছে।-সূত্র: বণিক বার্তা

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে