মো ইয়ানের সাক্ষাৎকার: আমি নারীদেরকে ভালবাসি ও শ্রদ্ধা করি

জুলফিকার হায়দার:

 

 

এ বছর নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন চীনের নিরীক্ষাপ্রবণ কথাসাহিত্যিক মো ইয়ান যার রচনায় লোকপুরান, সমকালের ইতিহাস এবং যাদুবাস্তবতার ব্যতিক্রমী মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। তিনি চীনের অভ্যন্তরে সুপরিচিত হলেও, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগ পর্যন্ত বহির্বিশ্বে ছিলেন অপেক্ষাকৃত স্বল্পপরিচিত। বিডিনিউজের পাঠকদের জন্য তাঁর একটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ প্রকাশ করা হল।

 

 

মো ইয়ান

মো ইয়ান চিনের নন্দিত লেখকদের অন্যতম। তার লেখা বিভিন্ন ভাষায় ব্যাপকভাবে অনুদিত হয়েছে। ইয়ানের জন্ম ১৯৫৫ সনে চিনের এক কৃষক পরিবারে। মাত্র বার বছর বয়সে তিনি গণমুক্তি ফৌজে যোগ দেন এবং প্রায় একই সময়ে গল্প লিখিয়ে হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। সেই থেকে তাঁর লেখা বেশ ক’টি উপন্যাস ও ছোট গল্প সংকলন বের হয়েছে যার মধ্যে Red Sorghum, Big Breasts & Wide Hips, Life and Death Are Wearing Me Out এবং অতি সম্প্রতি লেখা Frog. গত অক্টোবরে লন্ডন বই মেলায় গ্রান্টা সাময়িকীর সম্পাদক জন ফ্রিম্যানকে দেয়া এক নাতিদীর্ঘ সাক্ষাতকারে মো ইয়ান তার সাহিত্য-চিন্তা ও নিজের লেখা গল্প উপন্যাসের বিষয় ও প্রকরণ সম্পর্কে কথা বলেন।

জন ফ্রিম্যান: আপনার অনেক উপন্যাসে গাওমির নিজ শহরের আদলে চিত্রিত আধা-কল্পিত এক একটি পটভূমির দেখা মেলে, বলা যায়, ফকনারের আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের সাথে যার এক অর্থে সাদৃশ্য রয়েছে। এই আধোকল্পিত লোকালয়ে আপনার বারংবার ফিরে যাওয়া -সেটি কিভাবে সম্ভব হয়ে ওঠে? আর বিশ্বব্যাপি পাঠকগোষ্ঠির জন্য লিখতে গিয়ে সেই পটভূমির কি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে?

মো ইয়ান: আমার লেখালেখির শুরুর সময়টায় একটা পরিবেশ সেখানে ছিল, একেবারে খাঁটি পরিবেশ। কিন্তু পরে যখন আমার লেখালেখি বেশ বেড়ে গেল, আমার প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার রসদ প্রায় তলানিতে এসে ঠেকল; তখন একটু আধটু কল্পনার ডানায় ভর করার প্রয়োজন বোধ করলাম, এমনকি কখনো সখনো কিছুটা ফ্যান্টাসিও যোগ করলাম।

জন ফ্রিম্যান: আপনার কোন কোন লেখা গুন্টার গ্রাস্, উইলিয়াম ফকনার, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কথা মনে করিয়ে দেয়। আপনি যখন লেখক হিসেবে বেড়ে উঠছিলেন, তখন কি চীনে এসব লেখকদের বই পাওয়া যেত? আর আপনার উপর এদের প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

মো ইয়ান: আমার লেখালেখির শুরুটা হয় ১৯৮১ তে, সুতরাং সে সময়টায় গার্সিয়া মার্কেজ বা ফকনারের কোন বই আমি পড়িনি। ১৯৮৪ সালে আমি এদের লেখা পড়ি এবং নিঃসন্দেহে আমার লেখায় এ দুজনের প্রবল প্রভাব রয়েছে। আমি দেখলাম যে এদের সাথে আমার জীবনের অভিজ্ঞতার ব্যাপক সাদৃশ্য আছে তবে আমি সেটা ধরতে পারলাম বেশ পরে। এদের লেখা যদি আরও আগে পেতাম, আমিও হয়তোবা ইতিমধ্যে তাদের মত অসাধারন সব সাহিত্য সৃষ্টিতে সফল হতাম।

জন ফ্রিম্যান: রেড সর্ঘাম এর মত আপনার প্রথম দিক্কার উপন্যাসগুলোকে স্পষ্টতঃ ঐতিহাসিক ঘরানার মনে হয়, এমনকি কেউ কেউ সেগুলোকে ’রোমান্স’ হিসেবেও দেখেন অথচ আপনার সাম্প্রতিক সময়ের লেখা উপন্যাসসমূহে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও বিষয় বস্তুর প্রতি একটা বিষয়ভিত্তিক উত্তরণ লক্ষ্য করা যায়। আপনি কি সচেতনভাবেই এ ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসছেন?

মো ইয়ান: যখন রেড সর্ঘাম লিখি তখন আমার বয়স সবে তিরিশ। অর্থাৎ আমি তখন বেশ তরুণ। সে সময়ে আমার পূর্বসুরিদের জীবনের বিবেচনায় আমার জীবন ছিল অনেক রোমান্টিক অনুসঙ্গে পূর্ণ। আমি তাদের জীবন চিত্রায়নে ব্রতী হলাম অথচ এদের সম্পর্কে তেমন কিছু আমার জানা ছিলনা। অতএব তাদের চরিত্র চিত্রণে আমার কল্পনার রঙ মিশিয়ে দিলাম। আর যখন লাইফ এন্ড ডেথ আর ওয়্যারিং মি আউট লিখি তখন আমার বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। ততদিনে আমার রুপান্তর ঘটেছে এক তরুণ থেকে মধ্যবয়সিতে। সে এক অন্য জীবন। সে জীবন অনেক বেশি বর্তমান-ঘেঁষা, অনেক সমসাময়িক আর চলমান; সে সময়ের কন্ঠচ্ছেদী নিষ্ঠুরতা আমার একদা অনুভূত রোমান্সের লাগাম টেনে ধরে।

জন ফ্রিম্যান: আপনার গদ্যে আপনি প্রায়শ চিনের প্রাচীন লোকজ ভাষার (লাওব্যাক্সিং) ব্যবহার করেছেন, বিশেষত শ্যানডং এর আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার আপনার গদ্যে একধরনের দুর্ভেদ্য দেয়াল সৃষ্টি করে। এসব লোকজ কথামালা ও শব্দালংকারের কোন কোনটি যখন ইংরেজিতে ভাষান্তরের অনুপযোগী মনে হয়, তখন কি হতাশ বোধ করেন নাকি আপনি আপনার অনুবাদক হাওয়ার্ড গোল্ডব্ল্যাটকে সাথে নিয়ে সেই সব শব্দাবলিকে গড়াপেটা করেন?

মো ইয়ান: ঠিকই বলেছেন। আমার প্রথম দিকের লেখায় আমি যথেষ্ট পরিমানে আঞ্চলিক ভাষা, কথ্যরীতি, ও লোকজ শব্দালংকার ব্যবহার করেছি কারণ ঐ সময়ে আমার ধারণাও ছিলনা যে আমার লেখা অন্য ভাষায় অনূদিত হবে। পরবর্তিতে আমি বুঝতে পারলাম যে এ ধরনের ভাষার ব্যবহার অনুবাদকের জন্য বিরাট সমস্যা তৈরি করে। অবশ্য এর ফলে আমার লেখায় আঞ্চলিক ভাষা, কথ্যরীতি, ও লোকজ শব্দালংকার ব্যবহার করা থেকে আমি নিজেকে রিরত রাখতে পরিনি। কারন আমার ধারণা, আলংকারিক ভাষা হচ্ছে দৃশ্যমান, প্রকাশ-বান্ধব ও একজন লেখকের একান্ত নিজস্ব ভাষারীতির সবচে উজ্জ্বল স্মারক। সুতরাং একদিকে আমি যেমন আমার লেখায় কিছু আঞ্চলিক ও আলংকারিক শব্দের ব্যবহারে কিছুটা পরিবর্তন ও সমন্বয় আনতে পারি অন্যদিকে আমি আশা করি, অনুবাদকরাও আমার ব্যবহৃত শব্দমালার অন্তর্গত ব্যঞ্জনাকে আরেকটি ভাষায় যথাসম্ভব প্রতিধ্বনিত করার চেষ্টা করবে-আর সেটাই হবে আদর্শ।

জন ফ্রিম্যান: আপনার অনেক উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ কেন্দ্রিভূত হয়ে আছে এক একজন শক্তিশালী নারী চরিত্রকে ঘিরে। বিগ ব্রেস্টস্ এন্ড ওয়াইড হিপস, লাইফ এন্ড ডেথ আর ওয়্যারিং মি আউট এবং ফ্রগ-ইত্যাদি উপন্যাসে এসব নারী চরিত্রের দেখা মেলে। আপনি কি নিজেকে একজন নারীবাদী হিসেবে দেখেন নাকি লেখার সময় স্রেফ একজন নারীর দৃষ্টিকোন থেকে ঘটনাপ্রবাহকে অবলোকন করার প্রতি আগ্রহ বোধ করেন?

মো ইয়ান: প্রথমতঃ আমি নারীদেরকে ভালবাসি ও শ্রদ্ধা করি। আমার মনে হয় এরা অনেক মহৎ জীবনের অধিকারী এবং একজন নারীর অভিজ্ঞতা ও যে জীবন সংগ্রাম তাকে মোকাবেলা করতে হয় তা পুরুষের তুলনায় অনেক কঠিন। বড় কোন বিপর্যয়ের মোকাবেলায় নারীরা সবসময় পুরুষদের তুলনায় অধিক সাহসী মনে হয়–এটা তাদের যথাযথ সামর্থ্যের কারনেই, তারা আবার মাতৃত্বেরও অধিকারী। এথেকে যে শক্তিটা আসে তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনা। আমার লেখায় আমি একজন নারীর ভূমিকায় থাকতে চেয়েছি, একজন নারীর চোখ দিয়ে এই পৃথিবী দেখার ও বোঝার চেষ্টা করেছি। তবে এরপরেও মূল কথা হল আমি তো নারী নই, আমি একজন পুরুষ লেখক। এবং একজন নারীর দৃষ্টি দিয়ে আমার লেখায় যে পৃথিবীকে আমি তুলে ধরতে চেয়েছি তা হয়তোবা খোদ নারীদের কাছেই অগ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে; কিন্তু এ নিয়ে আমার তো করার কিছু নেই। আমি নারীদেরকে ভালবাসি আর তাদের প্রশংসা করি, অথচ এরপরেও আমি একজন পুরুষমাত্র।

জন ফ্রিম্যান: সেন্সরশিপের পাশ কাটিয়ে যাওয়াটা কি কেবলই চাতুর্য? যাদু বাস্তবতা ও অন্যান্য চরিত্রনির্মান-কৌশলের খুলে দেয়া পথগুলো একজন লেখককে মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে তার গভীরতম উদ্বেগ প্রকাশে কতটা সাহায্য করে?

মো ইয়ান: নিশ্চয়ই। সাহিত্যের আনেক ধারার মধ্যেই রাজনৈতিক বক্তব্য থাকে। যেমন আমাদের বাস্তব জীবনে হয়তো অনেক স্পর্শকাতর ও ধারালো বিষয় রয়েছে যেগুলো নিয়ে তারা হয়তো লিখতে আগ্রহী হন না। এমন পরিস্থিতিতে একজন লেখক তার কল্পনার মাধ্যমে নিজেকে সেই বাস্তব জগত থেকে আলাদা করে নিতে পারেন অথবা তাদের বর্ণনাকে অতিরঞ্জিত করতে পারেন যাতে করে তার রচনাটি তেজস্বী, স্পষ্ট ও আমাদের প্রকৃত পৃথিবীর স্মারক হয়ে ওঠে। সুতরাং আমি মনে করি এসব সেন্সরশিপ বা আরোপিত সীমাবদ্ধতা সাহিত্য সৃজনের জন্য বড় ভূমিকা রাখে।

জন ফ্রিম্যান: আপনার ইংরেজীতে অনূদিত সবশেষ বই ডেমোক্রেসি একজন বালক এবং একজন পরিনত বয়স্ক আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে চীনের একটি যুগের যবনিকার বর্ণনা দেয়। এই বইয়ে আমরা বেশ একটা বিষাদের সুর শুনতে পাই, এই বিষাদময়তা পাশ্চাত্যের পটভূমিতে কিছুটা বিস্ময়কর বটে- আমরা প্রায়শই বিশ্বাস করি যে বড় হাতের পি দিয়ে লেখা ’প্রগ্রেস’ শব্দটি সবসময় মঙ্গলময় কিছু একটার ইংগিত দেয় কিন্তু আপনার বইটি কি যেন একটা হারিয়ে ফেলার কথা মনে করিয়ে দেয়। এটা কি সঠিকভাবেই চিত্রিত হয়েছে?

মো ইয়ান: হ্যাঁ, যে চটি উপন্যাসটির কথা আপনি উল্লেখ করলেন সেটি আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও প্রাত্যহিক ঘটনাবলীতে পূর্ণ। তবে এতে কল্পনাশ্রয়ী বিষয়াদিও রয়েছে। বিষাদময়তার যে ছায়া আপনি সেখানে প্রত্যক্ষ করেছেন তা খুবই যথার্থ কারন সেই গল্পের আখ্যানে রয়েছে বিগত তারুণ্যের স্মৃতিকাতর চল্লিশ পেরুনো এক ব্যক্তি যে জানে তরুণ জীবনে সে আর ফিরবে না। ধরুন, যখন আপনি তরুণ ছিলেন তখন আপনি হয়তোবা কোন এক নারীর প্রেমপ্রার্থী ছিলেন কিন্তু কোন কারনে সে নারী এখন অন্যের ঘরণী এবং এই যে স্মৃতি এটাতো অবশ্যই বিষাদের। গেল তিরিশ বছর ধরে আমরা চীনের নাটকীয় উন্নতি দেখে আসছি সেটি আমাদের জনগনের জীবনমানের উন্নতি অথবা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বা আত্মিক মানের উন্নতি যাই হোক, সে উন্নতি বেশ দৃশ্যমান। কিন্তু নিঃসন্দেহে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে এমন আরও কিছু বিষয় রয়ে গেছে যা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। অবশ্যই চীনের অনেক উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু উন্নয়ন নিজেই অনেক বিতর্কিত বিষয় সামনে নিয়ে আসে, যেমন পরিবেশ অথবা নৈতিক অবক্ষয়ের সমস্যা। সুতরাং আপনি যে বিষাদের কথা বলেছেন তার কারণ মূলত দুটি। আমি বুঝতে পারছি যে আমার তারুণ্য ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছে আর দ্বিতীয়তঃ আমি চীনের বর্তমান অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন, বিশেষতঃ যেসব বিষয়ে আমি সন্তুষ্ট নই।

 

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে