হানা-রুথ টমসনের সাক্ষাৎকার

সাইমন জাকারিয়া:

 

ড. হানা-রুথ টমসন বাংলা ভাষার গবেষক। বাংলায় শিক্ষকতা করেছেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। অভিনব দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা তাঁর বাংলা ব্যাকরণ চমকিত করেছে গবেষকদের। সম্প্রতি বাংলাদেশে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন সাইমন জাকারিয়া।  সাইমন জাকারিয়া: জন্মসূত্রে বাঙালি না হয়েও দীর্ঘদিন ধরে আপনি বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করছেন। নানা দেশের মানুষ বাংলা শেখার জন্য এখন ব্যবহার করছেন আপনার লেখা বই। আপনার বাংলা ভাষা শেখার শুরু কেমন করে? হানা-রুথ টমসন: আমি প্রথম বাংলা শিখতে শুরু করি ১৯৯১ সালে। আমার স্বামী তখন বাংলাদেশে ইল্যান্ডভিত্তিক একটি উন্নয়ন প্রকল্পে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে সপরিবারে আমার এ দেশে আসা। এর আগে বাংলা ভাষা সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতাই আমার ছিল না। আবার আমি যে বাংলা ভাষা শিখব, তা নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। তবে তখনো আমি আশা করিনি যে এই ভাষাটি আমার এত ভালো লেগে যাবে। আমি প্রায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রীতিমতো বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে যাই। ‘প্রজাপতি’, ‘বৃহস্পতিবার’, ‘সাধারণত’—প্রথম দিকে বাংলা ভাষার এ শব্দগুলো আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বাংলা কত সুন্দর একটা ভাষা। সাইমন: ভাষাটি কীভাবে প্রথম শিখতে শুরু করলেন? হানা: বাংলা ভাষা শেখার জন্য প্রথমে আমি একটি স্কুলে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রতিদিন চার ঘণ্টার ক্লাস ছিল। আমার সঙ্গে যাঁরা ওই ক্লাসে ছিলেন, তাঁদের অনেকে আগে কখনো নতুন ভাষা শেখেননি। সে জন্য শিক্ষাটা চলছিল খুব আস্তে আস্তে। দ্বিতীয় মাস থেকে ক্লাসের চার ঘণ্টার মধ্যে আমি দুই ঘণ্টা ক্লাসে আর বাকি দুই ঘণ্টা অন্য একজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাদাভাবে বসে কথা বলি। এভাবে আমার যা যা দরকার ছিল, মোটামুটি দ্রুতই শিখে যাই। কিন্তু আমি তো শুধু স্কুলের ক্লাসে বসে বাংলা ভাষা শিখিনি। রাস্তায়, দোকানে, বাজারে—বিচিত্র জায়গায় সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাংলা শিখেছি অনেক বেশি। সাইমন: বাংলা অভিধান ও ব্যাকরণ লেখার তাগিদ আপনার মধ্যে তৈরি হলো কী করে? হানা: প্রথমে ভেবেছিলাম কিছুটা বাংলা শিখে একটা চাকরি ধরব। কিন্তু এক বান্ধবী আমাকে বলল, ‘তুমি বরং একটা অভিধান লিখে দাও। তুমি যত তাড়াতাড়ি বাংলা শিখেছ, তেমনভাবে আমরা কেউ পারিনি। আমাদের জন্য তুমি একটা অভিধান লেখো। একটা ব্যবহারিক সাধারণ ভাষার অভিধান আমাদের খুব দরকার।’ তাঁর কথাটা চিন্তা করে আস্তে আস্তে মনে হলো, আসলেই কাজটা আমি করতে পারি। নিজের জন্য আমি শেখার যেসব নিয়ম বানিয়েছি, অন্য মানুষের কাজে লাগতে পারে সেটা—এই ভাবনা থেকে ১৯৯৯ সালে আমার প্রথম বই এসেনশিয়াল এভরিডে বেঙ্গলি প্রকাশিত হলো, বাংলা একাডেমি থেকে। যতটা জানি, আমিই ছিলাম তাদের প্রথম বিদেশি লেখক। বইটা এখন একটু পুরোনো হয়ে গেছে, তবে এখনো অনেকের কাজে লাগে। বইটি লিখতে গিয়ে আমি টের পেলাম, বাংলা ভাষা নিয়ে আরও বহু কাজের অবকাশ আছে আর আমি সেটি করতে চাই। মানে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে গবেষণা করতে চাই। সে সময় আমি বাংলা ব্যাকরণের বই পড়তে শুরু করি। কিন্তু কোনো বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের মধ্যেই আমার অজস্র প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলছিল না। আমি যা জানতে চাই, তা নিয়ে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে বুঝে নিতে হচ্ছিল। সে কারণে ১৯৯৯ সালে লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে আমার পিএইচডি গবেষণা শুরু করি। এই হলো আমার বাংলা ব্যাকরণের বই লেখার গল্প। সাইমন: বিভিন্ন দেশের পণ্ডিত ও গবেষকেরা যেখানে বাংলা ভাষা, প্রাচীন ও বাচনিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন। আপনার ব্যাকরণ ও অভিধান বেছে নেওয়ার পেছনে কি আর কোনো কারণ ছিল? হানা: এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আপনার প্রশ্নের মধ্যেই লুকানো আছে। বাইরের অনেকেই গবেষণা করেন বাংলা সাহিত্য নিয়ে। অন্য কোনো ভাষার ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করার জন্য একটা বিশেষ রকমের ও বড় ধরনের সাহস দরকার। তা ছাড়া সাহিত্য আমার কাছে একটা সাগরের মতো। সাহিত্য নিয়ে সারা জীবন আলোচনা করা সম্ভব। এই সাগরের মধ্যে আমরা ভেসে বা ডুবে যাই। পায়ের তলায় কোনো মাটি পাই না। কোনো ব্যাপারে নিশ্চয়তা মেলে না। ভাষা আর ব্যাকরণ নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, নতুন কিছু ধরতে পারি, আমি যা বুঝতে পেরেছি, তা অন্যদের কাছে বুঝিয়ে বলতে পারি। আমার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, আমার বিদেশি ছাত্রদের জন্য কার্যকরী একটা বই লেখা, যাতে তারা ভালোভাবে বাংলা ভাষাটা শিখতে পারে। বাংলা শিখতে চাইলে যে পদ্ধতি বা নিয়মের প্রয়োজন হয়, তা আমি কোথাও খুঁজে পাইনি। তাই নিজের বিবেচনায় আমি প্রচুর উদাহরণ সংগ্রহ করেছি, ভাষা বিশ্লেষণ করেছি, আর কাজটাকে আপন করে নিয়েছি। সাইমন: একজন বিদেশি হিসেবে ইংরেজিতে বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান রচনার সময় আপনি কী কী সমস্যার মুখে পড়েছিলেন? হানা: বহু সমস্যার। যেমন ধরা যাক, ‘নয়’ আর ‘নেই’-এর পার্থক্য কী? কেন আমরা বলি, ‘আমি চিঠিগুলো পাচ্ছি’, আবার একই সঙ্গে বলি, ‘আমার ভয় পাচ্ছে’? কেন বলি, ‘এই কাজ করা দরকার’, কিন্তু ‘এই কাজ করার দরকার নেই’? আমি জানি, প্রতিটি ভাষা আর তার ব্যাকরণের মধ্যে একটা যুক্তি আছে। বাংলা ভাষার মধ্যে সেই যুক্তিটা আমি বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে চেষ্টা, ধৈর্য আর অনেক সময় লাগে। নিজের ধারণাগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে সংশোধন করতে হয়; ঠিক করতে হয় নিজের ভুলগুলো। এভাবে ব্যাকরণের বেলায় যা অস্পষ্ট ছিল, আস্তে আস্তে সেটি স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সব সময় অবশ্যই সহজে উত্তর পাওয়া যায় না। তখন প্রশ্নগুলোর সঙ্গে থাকতে হয়, প্রশ্নগুলোকে ঘিরে একটা উপায় বানাতে হয়। আমি খুব ভালোভাবেই জানি যে সবকিছুর সমাধান হবে না। তবে আশা করি, এ পর্যন্ত আমি যা করছি, অন্য কেউ সেটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করার কথা শুনে অনেকে আমাকে বলেছেন, তুমি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পড়ো। তাঁর লেখায় ব্যাকরণের অনেক কিছু পাওয়া যায়। এটা একটা ভুল ধারণা। কারণ, ব্যাকরণ তো আসলে যেকোনো ভাষার মধ্যেই পাওয়া যায়। ‘আমি আছি’, ‘তুমি আছ’, ‘সে আছে’—এই সাধারণ কথাগুলোর মধ্যেও ব্যাকরণ আছে। ব্যাকরণের জন্য কঠিন বাংলার দরকার নেই। বুদ্ধদেব বসুর লেখায় কত সুন্দর লম্বা লম্বা জটিল বাক্য আছে। সেসব বিশ্লেষণ করতে আমার খুব মজা লাগে। কিন্তু কোনো ভাষার গঠন বর্ণনা করার জন্য ওই ভাষার সহজ অংশটুকু নিয়েই কাজটা আরম্ভ করাটা বেশি জরুরি। সাইমন: আপনার নিজের লেখা বাংলা ব্যাকরণের বিশেষত্ব কী? হানা: আমার একটা সুবিধা এই যে আমি বাইরে থেকে এসেছি। ফলে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার ইতিহাস কিংবা সাধু ভাষা—এসব নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে হয়নি। আধুনিক ভাষার মধ্যে কী আছে, আধুনিক বাংলা ভাষার গঠনটা কেমন—আমি শুধু সেটাই বুঝতে চেষ্টা করছি। আর যাঁরা বাংলা শিখতে চান, তাঁদের জন্য আমি একটা উপায় ঠিক করতে চেয়েছি। বাংলা ভাষাটা তো আমি নিজেই শিখেছি। ফলে বাংলা ভাষা শিখতে গেলে কী কী সমস্যা হয়, কী কী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—তা আমি জানি। এই প্রেক্ষাপটটিই হয়তো আমার লেখা বাংলা ব্যাকরণের একটা বৈশিষ্ট্য। সাইমন: আমাদের বাংলা ব্যাকরণে সাহিত্যের উদাহরণ প্রচুর। আপনার ব্যাকরণের উদাহরণগুলো কী ধরনের? হানা: আমি উদাহরণ দিয়েছি মোটামুটি সাধারণ ভাষা থেকে। কারণ, আগে শিখতে হয় সাধারণ ভাষা। এখানে কিন্তু আমরা একটা কঠিন প্রশ্নের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। সেটি হলো ভাষার দাম। এখানে অনেকে মনে করেন, সাহিত্যের ভাষা সাধারণ ভাষার চেয়ে মূল্যবান। আমি এটা বিশ্বাস করি না। আমার ভাষা আমার খুব আপন জিনিস। সেটা আমি ত্যাগ করতে পারি না। কিন্তু কেউ যদি বলে, তোমার ভাষার কোনো মূল্য নেই, তাহলে সে আমার মানসিক মর্যাদার প্রতি আক্রমণ করে। আমার চোখে বাংলা ভাষা অনেক বিচিত্র। এই বৈচিত্র্য বাংলা ভাষার খুবই মূল্যবান একটা জিনিস। এখানে আমি এমন পার্থক্য করতে চাই না যে এই ভাষাটা মূল্যবান আর ওই ভাষাটা নয়। সমসাময়িক জীবন থেকে উদাহরণ নিয়ে আমি জীবিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ লিখি। ছয় বছর বয়সী বাচ্চার ভাষাও, যে সম্পূর্ণভাবে বাংলা ভাষা বলতে পারে, আমার কাছে মূল্যবান। সাইমন: বাংলাদেশের ব্যাকরণ চর্চা নিয়ে আপনার অভিমত কী? হানা: আমার মনে হয়, আপনাদের ব্যাকরণ বইয়ে একটা বড় সমস্যা আছে। সেগুলোতে যেসব উদাহরণ দেওয়া হয়, তা অনেক বছর আগেকার। বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের চিন্তাগুলো কেমন একটা ফানুসের ভেতরে আটকে আছে। সেখান থেকে যেন বাইরে বেরোনোর কোনো রাস্তা নেই। ভাষা তো জীবিত একটা জিনিস। ভাষার ভেতরে পরিবর্তন হতে থাকে। সেই পরিবর্তন থেকে ব্যাকরণের বর্ণনা ও বিশ্লেষণে নতুন বিবেচনা নিয়ে আসতে হয়। নইলে জীবিত ভাষা ও ব্যাকরণের মধ্যে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ে। সম্পর্কটা আসলে শিথিল হয়ে পড়েছেও। কিন্তু কেন, তা আমি ঠিক বুঝতে পারি না। ব্যাকরণ নিয়ে নতুন কিছু চিন্তা করা কি নিষিদ্ধ? বাংলাদেশের ব্যাকরণ বইগুলোতে যেসব উদাহরণ আছে, প্রায় ৮০ বছর হলো তাতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। কারক বোঝার জন্য এখনো পড়তে হয়, ‘ঢাকার নবাব ধনাগার হইতে স্বহস্তে দরিদ্রদিগকে টাকা দিতেছেন।’ বাক্যটি এতই পুরোনো যে সেটি থেকে কিছু পাওয়া কঠিন। নতুন কোনো উদাহরণ কি পাওয়া যায় না? কেন আমরা বলতে পারি না, ‘মা সকালে তার ছোট বাচ্চাটিকে দোকান থেকে কেনা দুধ খাওয়াচ্ছে?’ ব্যাকরণ তো সেই একই। তাহলে হঠাৎ করে আমরা দেখতে পাব যে, জীবিত ভাষা থেকেও আসলে ব্যাকরণ বের করা যায়। জীবিত ভাষার সঙ্গে ব্যাকরণের সম্পর্ক থাকে না বলে স্কুলের বাচ্চাদের কাছে ব্যাকরণ কত কঠিন মনে হয়; সেটা শিখতে এত কষ্ট, এত পরিশ্রম লাগে। তা থেকে কোনো আনন্দ পাওয়া যায় না। নিজের শেখার মধ্য দিয়ে আমি টের পাই ভাষা কত সুন্দর একটা জিনিস, ব্যাকরণ নিয়ে চিন্তা করতে কত মজাই না লাগে! সাইমন: বাংলাদেশের স্কুলের ব্যাকরণের কোনো উন্নতি দেখতে পেয়েছেন কি? হানা: বাংলাদেশের স্কুলের ব্যাকরণ বইয়ে সাধারণত দুটো অংশ দেখেছি: ব্যাকরণ আর রচনা। রচনা অংশগুলো অনেক এগিয়ে যায়। প্রতিবছর তাতে নতুন বিষয় ঢুকে পড়ে। সন্ত্রাস, নারী—এসব বিষয় নতুন করে রচনা অংশে ঢুকেছে। কিন্তু ব্যাকরণ অংশে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই একটা নতুন কায়দা, নতুন উপায় বের করতে হবে। বাচ্চাদের মুখের ভাষা নিয়ে ব্যাকরণ আরম্ভ করতে হবে। তাহলে বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি নিজেরাই বুঝতে পারবে, বাংলা ভাষায় কত কিছু আছে, এ ভাষা থেকে কত কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব। এই আবিষ্কারের মধ্যেও যে কত আনন্দ আছে। এ দেশের ব্যাকরণ চর্চাকারীদের কাছে এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে