ঈদের দিনে “মায়ের স্মৃতি শুধু কাঁদায়”

ছৈয়দ আলম :
মা, ভালো আছেন নিশ্চয় ওপাড়ে! তোমার জন্য এভাবে লিখব, বা তোমাকে হারানোর পর আমি এভাবে সন্তান হারা হব কখনো কল্পনা করিনি “মা”। কিন্তু কেন জানি আজ মুখ ফেরাতে পারছি না। প্রতিক্ষণ মনে পড়ছে মা তোমাকে। তুমি কি এই খুশির দিনে ঈদের নামাজের পর আমার সামনে এস বাবা বলে বুকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করে আবার ওপাড়ে চলে যেতে পারনা? মা পৃথিবীতে এমন কেউ নেই আজকের দিনে খুশি করছেনা? সেই মহা খুশি থেকে একমাত্র আমি অভাঁগা মা হারা এতিম সন্তান হিসেবে ঈদ উপলদ্ধি করতে পারছিনা।
মা, আমার মত কত সন্তান মা হারা বাবা হারা ঈদ করছে? তবুও চোখে মুখে কান্নার রোল। তবুও একটু সান্তনার জন্যই সাহস করে লিখতে বসেছি মা —-মা তুমি কি আমার ফরিয়াঁদ শুনতে পাও?
মা, কাল রাতে চাঁদ দেখার পর থেকে তোমাকে নিয়ে বাজে একটি খোয়াব দেখেছি। অমন সর্বনাশা খোয়াব দেখার পর কেমন আছেন মা, সামনে এসে তোমায় খুব দেখতে ইচ্ছে করছে “মা”।
মা তুমি মারা যাওয়ার বয়স আজ প্রায় ৫ বছর। এখনো পর্যন্ত নিত্যরাতে তোমার মধুমাখা ছবিটি বুকে নিয়ে ঘুমাই। আর সবসময় তোমার ছবি আমার ম্যানিব্যাগে রাখি। মা আমার একমাত্র ধন তো তুমি, তাই না? ছেলে হয়ে কেউ মায়ের ছবি অন্য কোথাও রাখতে পারে, বল? বল মা?
রোজ রোজ আঁচল দিয়ে মুছে রাখি ওটি। ও ছাড়া আমার কি আছে আর? কাল রাতেও যতœ করে মুছে নিয়ে বুকে করে ঘুমিয়েছিলাম মা তোমার ছবি নিয়ে।
মধ্যরাতের খোয়াব নাকি ভালো হয় না। আমার কপালেও ঠিক তাই হলো।
দেখি, একটি পিঁপড়া আমার বাসায় রেখে যাওয়া তোমার ছবির উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। যে-ই তোমার গালের ওপর বসেছে, অমনি চিৎকার করে উঠেছি।
নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি নি। বয়স তো মোটামুটি এখন ২৬ পার করছি। এখনো মা হারা আমারবোনদের স্বান্তনা দিতে পারছিনা কেন মা? তাই। আমার কি দোষ, বল? আমি চিৎকার না দিলে হারামজাদা পিঁপড়া দিব্যি কামড় বসিয়ে দিত। তাতে আমার বুক যে খান খান হয়ে যেত।
মনে পড়ছে, আঁতুর ঘরের সেই রাতের কথা। মা তোমাকে নিয়ে যখন ঢাকা চট্টগ্রামে হাসপাতালের বারান্দায় বারান্দায় গৌড়তাম তখন আমি অঝড়ে কান্নায় তোমার মাথার কাপড় দিয়ে অশ্র“ মুছে ফেলতাম। তোমার সেই আদর আমার কাছে এখনো পথচলার পথে বাধা সৃষ্টি করে। আজ ঈদের দিনে তোমাকে পাওয়ার আনন্দে আগের দু’রাত এক বিন্দু ঘুমও আসেনি। একটু তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব। এর-ই মধ্যে পিঁপড়া কখন যে তোর গালে কামড় বসিয়েছে, বুঝতে পারিনি। লাল তুলতুলে গাল যেন রক্তবর্ণ হয়ে গেল।
আমার কান্না আর থামায় কে? অন্য ঘর থেকে তোমার ওয়াদাবদ্ধ রেখে যাওয়া (আদরের বউ জেসমিন) দৌঁড়ে এসে প্রথমে অবাক হলো। এরপর মা-ছেলের আদুরে ভঙ্গি দেখে মুচকি হাঁসি দিয়ে বেরিয়ে গেল।
অমন আহ্লাদ দেখে, ওই রাতে সেই আমাকে বকনি দিয়ে বলল, ‘দেখ তোমার কান্নায় আজ আকাশ বাতাশ ভারি হয়ে গেছে। তাই বলে আমাকে স্বান্তনার বানী দিয়ে ঘর ত্যাগ করল।
আমি বিশ্বাস করিনি। আমার মা কি সত্যি আমার কাছে এসেছে? অভিমান করে একদিন পাল্টা জবাবে বলেছিলাম,‘আপনার মুখে ছাই পড়ুক।’ তাই পড়েছে আজ।
আজ আমার “মা” বেঁচে থাকলে আমাকে বলত,‘ -আমার খোকা আমাকে কত যতœ করে বৃদ্ধাশ্রমে রেখেছে।’
কেন জানি গলাটা ধরে আসছে রে? তবে হ্যাঁ, ও কিছু না। দিব্যি বলছি, আবেগে নয়, বুকের ব্যাথার কারণে অমন হতে পারে।
খোয়াব দেখার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে বুকের ব্যাথা বেড়েছে। কপালে সামান্য আঘাত পেয়েছি। ফার্মেসী থেকে প্রয়োজনীয় ওষুদ সেবন করেছি। তখন ঈদের নামাজ পড়তে যেতে অনিহা প্রকাশ করছে তারপরেও নাছোরবান্দা মনে হয়েছে আমার কোন রকম গেলাম ঈদের নামাজ পড়তে। কিন্তু তাও বুঝি আর হবে না। আজ আবার রাত থেকেই পিঠে টান পাচ্ছি। তুমি চলে যাওয়ার সময় অমন টানের কথা বলেছিল আমার সহপাঠিরা ওই কারণেই আর ভরসা পাচ্ছি না।
একদিন কক্সবাজার সী-সাইড হসপিটালে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হওয়ার পর মা কে যখন অপারেশন দিচ্ছে ডা: আসাদুজ্জামান খোন্দাকার। তখন বাইরে আমি অপেক্ষা করছি মা,কে নিয়ে আবার হাসপাতালের বেডে নিয়ে যাব। তখন আমার প্রসাব-পায়খানাও তাতেই করতে হচ্ছে। ঠিক সেই মুহুর্তে ডা: খোন্দকার সাহেব আমাকে ডেকে বলল, তোমার মা,কে যা খাওয়ার ইচ্ছা যা করার ইচ্ছা করে নাও আর মাত্র তিনমাস এভাবেই থাকবেই—তোমার মায়ের দুরারোগ্য ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে পুরো শরীর ছড়িয়ে গেছে। তখন আমি কান্না ধরে রাখতে পারলাম না—মায়ের একমাত্র ছেলে হিসেবে আমার বাবা ও বোনদের কিছুই বলিনি। তখন মনকে শক্ত করে সিদ্ধান্ত নিলাম মা,কে যেভাবে পারি সাধ্যমত চিকিৎসা চালিয়ে যাব। মুহুর্তের মধ্যে বাবাকে ফোন দিলাম, বাব কে বললাম, মায়ের অবস্থা খারাপ আমাদের জায়গা-জমি যা আছে সবকিছু দ্রুত বিক্রি করে ফেলেন অনেক টাকার দরকার।
কিন্তু তখন অচেতন অবস্থায় কে যেন পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে, বুঝতে পারিনি। সম্ভবত ডাক্তার এর সহকারি ছেলেটি-ই হবে। ওর নামও খোকা।
তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন ভাই আজকের পর থেকেই তোমার মা, কে আমি ‘মা’ বলে ডাকব। ওর মা নাকি দেখতে ঠিক আমার মায়ের মতোই ছিল। রোজ রোজ ওর বাড়িতে নেয়ার বায়না ধরে। আমি সায় দিইনি।
ওর বাড়িতে গেলে মা তোমার মান ও অপারেশন ক্ষতি হতে পারে, তাই কোনোদিন পাত্তা দিইনি। একদিন ওর স্ত্রীও এসেছিল আমাকে নিতে। ওর নাম খেয়া। যাইনি বলে কি অভিমানের কথা গো বাপু?
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলছিল, ‘আমি যদি তোমার মায়ের ছেলের বউ হতাম, তাইলে এভাবে ফিরিয়ে দিতে পারতা?। বল, পারতে? আমার যে কপাল পোড়া, তাই তুমি গেলে না’ ওইদিন ওর প্রশ্নের কোনো জবাব সরছিল না।
তবে মা কথা দিয়েছিল আমাকে আমার দাদা-দাদি ও আতœীয়-স্বজনের কবরের পাশে কবর দিতে। যাক ওদিকে আর যাচ্ছিনা —মা মারা আগ মুহুর্তেও বলেছিল, আমার মায়ের লাশ আমার ছোট মামা মাওলানা মফিজুর রহমান মাদানীকে দিয়ে দাফন দিতে। হুবহু মায়ের কথা অনুযায়ী মামাসহ সকলের উপস্থিতিতে দাফন সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরলাম—–দেখলাম বোনদের ও বাবার কান্না আর কান্না কিছুতেই থামানো যাচ্ছিলোনা। যাই হোক —-আজ আমি বড় একা সন্তান হারা অবুঝ শিশুর মত রয়ে গেছি “মা” আজকের এই দিনে তুমি কি এক মিনিটের জন্য হলেও দেখা দিবে?

ঈদের দিন আশীর্বাদ করছি, আমার মা,কে নিয়ে যেন এমন সর্বনাশা খোয়াব না দেখি। আর আমার মত কেউ সন্তানহারা হয়ে ঈদ না কাটায়?
পরিশেষে আমার মায়ের জন্য সকলের কাছ থেকে দোয়া কামনা করছি।

ইতি—
মা হারা আপনাদেরই ভাই পথহারা পথিক—–ছৈয়দ আলম—গণমাধ্যম কর্মী, কক্সবাজার।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে