একটি মৃত্যু

সকালে শ্বশুর আমাকে ফোন দিয়ে বললেন তিনি আমার নাম্বারটা একজনকে দিতে চান । যাকে নাম্বারটা দিবেন তাঁর ভাগিনা কুয়ালালামপুর হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কুয়ালালামপুর তাঁদের আপন বলতে কেউ নাই ।

আমি যেন ছেলেটার খোঁজ খবর নেই। কয়েক মিনিট পর ইটালি থেকে ফোন আসল। আমি তাঁর কাছ থেকে হাসপাতালের নাম্বারটা নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। এই বার স্কটল্যান্ড থেকে ফোন দিয়ে বললেন আমি তামিমের বোন বলছি। আপনি কি এখন হাসপাতালে ? আমি এইবার অনুধাবন করলাম বিদেশে কেউ অসুস্থ হলে তার আপনজনরা কতটুকু পেরেশান হয়ে পড়ে।

মালয়েশিয়া আসার পর একদিন আমার জ্বর হয়েছিল। আমি তখন আমার ইউনিভার্সিটির এরিয়া সাইবারজায়াতে থাকি। আমার জ্বরের বিষয়টা শুধু আমার বেগম জানতেন। আমার অভ্যাস জ্বর হলেই আমি ডাক্তারের কাছে যাইনা । দুই দিন পর্যবেক্ষণ করার পর যদি দেখি জ্বরের বিদায় হওয়ার নাম নেই তখন আমাকে বাধ্য হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। আমি বাসায় একা শুয়ে আছি ।

কিছুক্ষণ পর দেখি প্যারাসিটামল নিয়ে কুয়ালালামপুর থেকে আমার দুলাভাই মিলন হাজির। তার মোবাইল চেক করে দেখলাম এই সময়ের মধ্যে অসংখ্য বার তাকে দেশ থেকে আমার বেগম কল করেছেন। আমার জন্য বেগম পেরেশান। আমি তামিমের বোনের পেরেশানি বুঝতে পারলাম। সব আপন জনদের উৎকণ্ঠা হয়ত এমনি। আমি হাসপাতালে এসে দেখলাম অবস্থা খুব-ই ভয়াবহ। যেটা তামিমের বোন মা জানেননা। তামিম রাত ৩ টায় ব্রেইন স্ট্রোক করে ।

তার সাথে একই ফ্লাটে আরও ৬ জন থাকে। তারা তামিমের অঙ্গ ভঙ্গি দেখে মনে করেছে তামিমকে জীনে ধরেছে। তামিমের বন্ধুরা একজন আলেমকে বাসায় ডেকে আনলেন। তামিম অচেতন। আলেম সাহেব ঝাড়ফুঁক করলেন সারারাত। পানি পড়া দিলেন। সেটা এক বন্ধু ভিডিও করে রাখলেন। তামিম সুস্থ হলে তামিমকে দেখাবে বলে । কিন্তু তামিমের কোন সাড়া নেই । বন্ধুরা কেউ সাহস করলেন না হাসপাতালে তামিমকে নিয়ে ভর্তি করার। কারণ তাদের কারো কাছেই বৈধ কাগজ নাই। সকাল ১০টা ৩০ মিনিট । তামিমের বন্ধুরা কি করবে কিছু বুঝতে পারছেনা। তামিম তখনো অচেতন। শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেশী । তাদের একজন কল করল তামিমের আরেক বন্ধুকে। তার নাম মিলন।

মিলন খবর শুনে ছুটে এসে প্রথমে তার পরিচিত এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় । ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন কুয়ালালামপুর হাসপাতালে নিয়ে যেতে। এরপর মিলনের কাগজ দিয়ে তামিমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিকেল ৫টা। তখনো জ্ঞান ফিরেনি। ডাক্তার বললেন অনেক দেরি হয়ে গেছে ভর্তি করতে। অপেক্ষা করেন। রাত ৭.৩০ মিনিট। ডাক্তার আমাদের ডাকলেন।

বললেন রোগীর আত্মীয় কে হন ? ইউএই মানি একচেঞ্জের হেড অফ রেমিটেন্স রেজাউল ভাই আমাকে দেখিয়ে দিলেন। ডাক্তার খুব শান্ত ভাবে বললেন এর মধ্যে ৪ বার হার্টবিট ড্রপ হয়েছে। এটাই লাস্ট। আপনারা একজন একজন করে রুগীর পাশে গিয়ে প্রার্থনা করতে পারেন ।

তখন আমার মোবাইলে তামিমের বোনের রিং বাজছে। আমি শুধু ফোন ধরে বললাম- দোয়া করেন। তামিমের বোনের কান্না শুনতে পাচ্ছি। তামিমের বন্ধুরা দেয়ালের সাথে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে । কয়েক মিনিট পর ডাক্তার নার্সদের তৎপড়তা লক্ষ্য করলাম। সবাইকে বাহিরে যেতে বললেন। সবাই বাহিরে চলে গেলেন আমি শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম । মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি । একজন ডাক্তার আমার দিকে এগিয়ে আসলেন ।

আমি বুঝলাম তিনি আমাকে কি বলতে আসছেন। আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তার মুখে হাসি রাখার বৃথা চেষ্টা আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন সরি ব্রাদার। আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। আমার চোখের সামনে ২২ বছরের এক টগবগে তরুণের চলে যাওয়া আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। তামিমের পরিবারকে জানানো হল। আমার কান্না পাচ্ছে। আমার মায়ের মৃত্যু খবরটা ঠিক এইভাবেই আমাকে জানানো হল ।

আমি পরীক্ষার জন্য পড়ছি। কালকে ফাইনাল পরীক্ষা। রাত ১১টার দিকে ভাই ফোন দিয়ে বললেন মা বলেছে তোকে মন দিয়ে পড়া লিখা করতে। পরীক্ষা শেষ হলে বাড়িতে আসিস। আমি এইদিকে সব ঠিক করে নিব। আমার বুঝলাম আমার মা আর নেই । সেই কান্না আমার আজো থামেনি। কিন্তু সন্তানের মৃত্যু খবর মা কীভাবে নিবেন আমি মিলাতে পারছিনা। তামিমের বন্ধুরা আমাকে ডাকলেন লাশ দ্রুত কীভাবে দেশে পাঠানো যায় তার ব্যবস্থা করার জন্য। কারণ এই ৩দিন সরকারি বেসরকারি সব অফিস বন্ধ। তামিমের পাসপোর্ট তার কলেজে। আমি বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর স্যারকে ফোন দিলাম। স্যার ফোন ধরেননি । এবার কল দিলাম ফার্স্ট সেক্রেটারীকে । তিনি কল ধরলেন । বললেন কালকে সকালে ট্রাভেল পাস রেডি করে রাখবে আর আপ্প নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম্বার দিলেন যারা দায়িত্বের সাথে বাংলাদেশে লাশ পাঠিয়ে থাকে। আমাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিলেন ফার্স্ট সেক্রেটারী।

তামিমের আইকার্ড ফার্স্ট সেক্রেটারীকে হোয়াটসআপ করলাম। এর মাঝে কাউন্সেলর স্যার কল ব্যাক করলেন । বললেন ফিরোজ আমি একটা মিটিং এ ছিলাম। বল কেন ফোন দিয়েছিলে? আমি বিষয়টা বললাম এবং ফার্স্ট সেক্রেটারীর সাথে কথা হয়েছে সেটাও বললাম। খবরটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। হয়ত নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছেন। বিদেশে হাইকমিশন হচ্ছে অভিভাবক। একটি মৃত্যু একজন অভিভাবকের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। হাইকমিশনের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে ৩ দিন বন্ধ থাকার পরেও তামিমকে আমরা কালকে তাঁর মায়ের কাছে পাঠাতে পারছি । মা ছেলেকে গ্রহণ করার জন্য আজ থেকেই অপেক্ষা করছে । কখন তামিম আসবে ? কখন দেখবে ছেলেকে ? আমি যখন ঢাকা থেকে ছুটিতে বাড়িতে যেতাম মা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতেন আমাকে রিসিভ করার জন্য ।

আমার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে সোজা খাবার টেবিলে পাঠিয়ে দিতেন। টেবিল ভর্তি খাবার । সব খাবার একে একে আমার প্লেটে উঠিয়ে দিতেন । মনে হত এক বসাতেই মা আমাকে রিষ্ট পুষ্ট বানিয়ে ছাড়বেন। কিন্তু আজ ছেলের কফিনের জন্য অধীর অপেক্ষায় নির্ঘুম রাত পাড় করছেন তামিমের মা। কখন ফিরবে খোকন? কখন দেখবে শেষ দেখা বুকের মানিককে । সন্তানকে কবর দিয়ে এসে মায়ের সেই কান্না কীভাবে বইবে প্রকৃতি? হে আল্লাহ তুমি মাকে সাহস দিও দুখ্য সইবার।25660201_10204076410468609_3674322131870050235_nতরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, জাফর ফিরোজের ফেসবুক থেকে নেওয়া।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে