এক একদিন প্রতিদিন

প্রভাতী দাস:

এদেশে ভরা গ্রীষ্ম চলছে এখন। এবারের গ্রীষ্ম বড্ড বৃষ্টি মুখর তাই খুব আর্দ্র; দেশী শ্রাবণের কথা মনে রেখেই বুঝি। আমাদের ছোট্ট টিলার চারদিকটা গাঢ় সবুজে ঘেরা। আকাশকে প্রায় ঢেকে দেবার অহংকারে ঘন সবুজেরা সূর্য-কিরণকে যেন অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে আঙিনার কিছু কিছু অংশে। আমার ছোট্ট ফুল বাগানের ভেজা মাটি এবার আগাছার স্বর্গে পরিণত হয়েছে। ফুল গাছগুলোকে আগাছাদের কবল থেকে বাঁচিয়ে রাখা যেন প্রতিদিনের যুদ্ধ। সকালে ঘুম ভেঙেছে একটু দেরী করে কাজে বেরুতেও দেরী হবে, তবু চায়ের কাপ হাতে বাগানে একটু ঢুঁ মেরে যাই বেরিয়ে যাবার আগে। কোমল সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে নীল কিছু অপরাজিতা ফুটেছে, আর ঘন সবুজ লতানো বেলির গাছে সাদা বেলি; সামনের আঙ্গিনার পুরোটাই সুবাসিত। বেলির স্নিগ্ধ ঘ্রাণে মন ডুবিয়ে সারাটি দিন বসে থাকতে ইচ্ছে করছিল খুব। কিন্তু দ্রুত কাজের পথ ধরতে হলো বেলি-অপরাজিতাদের বিদায় জানিয়ে। আনন্দ-উৎসবের আয়েশি রেশে দু-সপ্তাহ কাটিয়ে কাজে ফিরে টের পেয়েছি অনেক কিছু জমে গেছে, আবার ব্যাক ডেট থেকে কারেন্ট হবার প্রচেষ্টায় কাটছে আমার। গাড়ী নিয়ে টিলা উপর থেকে ঢালে নেমে আসতে আসতে এফএম 94.7 শুনছিলাম; মেয়েদের দুজনের প্রিয় স্টেশন। ওদের সাথে শুনতে শুনতে আমারও বেশ অভ্যেস হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে চমৎকার কিছু গান বাজায়। আজ রেডিও অন করতেই ভেসে এলো ব্যান্ড পেরি’র গান, “If I die young, bury me in satin Lay me down on a bed of roses Sink me in a river at dawn Send me away with the words of a love song” খুব মন কেমন করা গান, বেশ কয়েক বছরের পুরানো গান। কথাগুলো মুখস্ত হয়ে গেছে শুনতে শুনতে একরকম। কেন যেন ভালো লাগছিল না এমন গান শুনতে এই কাঁচা সবুজের সকালে। রেডিও বন্ধ করে দেবো দেবো ভাবছি, এমন সময় পথের পাশের একটা গাছে চোখ আটকে গেল হঠাৎ। এতো বৃষ্টির অকৃপণ জল, এতো ছায়ার পেলব মমতা সব পেয়েও এই বৃক্ষের একটি শাখার সবগুলো পাতায় লালচে হলুদের ছোপ লেগেছে! আশপাশের সব সবুজের কাছে কি বেখাপ্পা লাগছে ওদের। এখনও গ্রীষ্মের প্রায় অর্ধেক বাকি, এখুনি হেমন্তের রং ওদের গায়ে কে লাগিয়ে গেল! রেডিওতে কিমবার্লি পেরি তখন গাইছেন, “Lord make me a rainbow, I’ll shine down on my mother She’ll know I’m safe with you when she stands under my colors, oh, And life ain’t always what you think it ought to be, no Ain’t even grey, but she buries her baby” নাহ, এবার গানটা আর সহ্য করতে পারলাম না, বন্ধ করে ড্রাইভে মন দিলাম। ২. এক সকাল জমে থাকা নোট লেখা শেষ করে হাসপাতালের পথে। এবার খুব সতর্ক দৃষ্টিতে পথের দু’ধারের গাছগুলোকে দেখছিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত হলুদ-কমলা-বাদামী ছোপ ছোপের সন্ধান মিললো আবারো। বিস্তৃত ঘন সবুজের ব্যক্ত উচ্ছ্বাসের আড়ালে অব্যক্ত বেদনার মতোই লুকিয়ে ছিল বুঝি তারা। কেন এমন…! হাসপাতালে বেশ অনেক ক’টি কনসাল্ট জমে গেছে, আবার পথে মন দিলাম। কাজ সেরে ফিরতি পথে মনে পড়ল, বিকেলে এক আড্ডায় যেতে হবে, ছোট-খাট হলেও একটা উপহার কেনা চাই। হোম গুডসের প্রিয় একটা দোকানের কথা ভেবে রওনা হলাম। এই দোকানটি আমার অনেক প্রিয়। মন খারাপ হলে, বা করবার মতো কিছু না থাকা অকারণের দুপুরে আমি এখানে ঘুরে বেড়াই। ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে এরা দোকানের সাজগোজ, আসবাব, বিক্রয় সামগ্রী বদলায় ঋতুর রঙের সাথে মিলিয়ে। বসন্ত-গ্রীষ্মে নানা শেডের সবুজ-গোলাপী-বেগুনী-সাদা, হেমন্তে হলুদ-কমলা-খয়েরী, শীতে লাল-সোনালী-সাদা উপকরণে সাজায় এরা দোকানটি।  আজ সামনে গাড়ী পার্ক করে নেমে আসতেই বড় বড় সেল সাইন নজরে পড়ল, মনটা এই প্রথম একটু খুশী। কম দামে অবশ্য ক্রয়ের সামগ্রী পেলে কে না খুশী হয়, আমিও। ভিতরে ঢুকেই খুশীটুকু বুদবুদের মতোই এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। দোকানের শেলফে, হলুদ, কমলা, খয়েরী রঙের ছড়াছড়ি। ঝরা পাতার হেমন্ত এই মধ্য গ্রীষ্মে সাজানো মঞ্চের মধ্যমণি আর বসন্ত গ্রীষ্মের বর্তমান সবুজ সেল র‍্যাকে স্বল্পমূল্যে বিক্রিত হবার অপেক্ষায়। আড়তদারের উপযোগের হিসেবে বর্তমান এভাবেই বুঝি বিকিয়ে যায় ভবিষ্যতের কাছে। একটু এদিক ওদিক দেখে বেরিয়ে এলাম কিছু না কিনেই। সেলে বসন্ত-গ্রীষ্মকে কিনে নিতে মন সায় দিলো না, আর আগ বাড়িয়ে হেমন্তকেও সাথে নিতে পারলাম না কেন যেন। ফিরতি পথে বাড়ীর র কাছে সেই গাছের নীচে এসে একটু থামার লোভটুকু সামলাতে পারলাম না। পথের একপাশে গাড়ি থামিয়ে গাছের নীচে নেমে নীচ থেকে হলুদ-খয়েরী পাতা গুলো ছুঁয়ে দেখলাম, সবুজ পাতার মতো মসৃণ নয় কিছুটা রুঢ়, আবার একইসঙ্গে তার গায়ে যেন লেপটে আছে একটু অকাল আড়ষ্টতাও। পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া এক পথিক আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, -তোমারও নজর কেড়েছে অকাল হেমন্তের এই রঙ! সুন্দর, তাই না? মাথা নাড়িয়ে সায় দিতে দিতে মাটি থেকে একটি ঝরা পাতা তুলে নেই হাতে, বিমর্ষ সুন্দর। স্বল্প পরমায়ু শেষ হয়েছে তাদের ইতোমধ্যেই; কয়েকটি ঝরেও পড়েছে মাটিতে। সকালে শোনা ব্যান্ড পেরির গানের শেষ অন্তরাটি মনে পড়ে যায়…, ‘A penny for my thoughts, oh, no, I’ll sell ’em for a dollar They’re worth so much more after I’m a goner And maybe then you’ll hear the words I been singin’ Funny when you’re dead how people start listenin” ৩. বাড়ি ফিরতেই বুঝতে পারি, ভাবনার পাগলামিতে সাড়া দিতে গিয়ে বেশ একটু দেরীই হয়ে গেছে ফিরতে ফিরতে। ছোট মেয়ে অধীর অপেক্ষায়। তার খুব প্রিয় এক বন্ধুর বাড়িতে আড্ডা তাই তর সইছে না আর ওর। দ্রুত মেয়েকে তৈরি করে নিজেও তৈরি হয়ে নেই। আগের রাতে গুছিয়ে রাখা শাড়িটি পড়ে বেরিয়ে এসে দেখি, বর ক্যামেরা নিয়ে প্রস্তুত। শাড়ি পড়লেই ছবি তুলবার আমার একান্ত শখের সাথে ওর অনেক বছরের জানাশোনা, আজকাল আর বলে দিতে হয়না। ছবি তুলবার জন্য বেরিয়ে এসে উঠোনের ঘন সবুজের রাজত্বে দাঁড়িয়ে নিজেকে হলদেটে পাতাটির মতো লাগে। আমার শাড়ীতে দুটোই কেবল রঙ; হলুদ এবং খয়েরী। আশ্চর্য! আমিও…! শাড়ি বদলে নেবার সময় আর নেই, সবুজ থেকে আড়াল খুঁজে সাদায় এসে ছবি তুলতে বসলাম। প্রতিটি নিউরনে তখনও কিমবার্লি পেরি গেয়ে যাচ্ছিলেন, ‘Gather up your tears, keep ’em in your pocket Save ’em for a time when you’re really gonna need ’em, oh The sharp knife of a short life, oh well I’ve had just enough time… Sink me in a river at dawn Send me away with the words of a love song’ প্রথম দু’টি ছবি তুলবার পর প্রিভিউ দেখে বর বলে, কি ব্যাপার হাসতে ভুলে গেলে নাকি। এ-তো বিষাদ প্রতিমা হয়ে যাচ্ছে সব…। ওর দিকে তাকাতে তাকাতে, এই লাইনটা শুধু মনে পড়ল, ‘I’ve had just enough time’ হলদে পাতার অকারণ বিষণ্ণতা আর চোখের জলটুকু অন্য কোন দিনের জন্য তুলে রাখতে রাখতে স্বভাবগত হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে ক্যামেরার দিকে তাকাই, এবার। ৪. গত বৃহস্পতিবার রাতে অনেক ক্লান্ত দিনের শেষে বাড়ী ফিরেও, সোমবার সকালে দেখা অকাল হেমন্তের বিষণ্ণতার কথা এতো লিখতে ইচ্ছে করলো…! রাত জেগে লিখে ঘুমুতে যেতে যেতে ভাবছিলাম সকালে উঠে সবুজের মাঝে হলুদ-লাল পাতার কিছু ছবি তুলে লেখাটা পোষ্ট করবো। তখন রাতের প্রায় শেষ প্রহর; নির্ঘুম কাটলো বাকিটা রাত । শুক্রবার সকালে কাজে এসে নেট অন্য করতেই, ব্লগার নিলয় হত্যার খবর, ছবি; ফোটা ফোটা রক্ত ছিটানো চারপাশের দেয়ালে, মেঝে ভেসে গেছে  রক্তে, লালে।  লেখার হত্যায় ধারালো চাপাতি আবার; দিন দুপুরে, আপন ভবনে। অকাল লাল-হলদের ছোপ লেগে ঝরে পড়া পাতার জন্য তুলে রাখা বিষণ্ণতা আর চোখের জলটুকু ফিরিয়ে আনি । ব্যান্ড পেরিকেও ফিরিয়ে আনতে হয় আবার, ‘…the sharp knife of a short life’ আশামনি ওকে ভালোবাসায় মুড়িয়ে দেবে নিশ্চয়, কিন্তু নিলয় তো যথেস্ট সময় পায়নি। নিলয়-এর অভিযোগ যারা শুনবার তারা কেউ শোনেনি। আশামনি’র কান্না কেউ শুনছে কি?  পেনিস ফর নিলয়’স থট…! নাহ, তাও নয়…। সেই যে… ‘They’re worth so much more after I’m a goner And maybe then you’ll hear the words I been singin’ Funny when you’re dead how people start listenin” জীবিতদের কথা যারা শুনবার তারা শোনে না। এ’রকম ঘটে যায়; আবার, বার বার। মৃত নিলয়-এর কথাই নাহয় কেউ শুনুক, কোথাও…, কেউ…!

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে