ওরা আর ফিরে যাবে না!

চিররঞ্জন সরকার : তৃতীয়বারের মতো কক্সবাজার গিয়েছিলাম রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে। গেলো বছরের ২৫ আগস্টের পর নাফ নদীতে অনেক জল গড়িয়েছে। প্রায় ৮ লাখ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় এক ধরনের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যেক পরিবারের জন্য তাঁবু খাটিয়ে আলাদা বসতির ব্যবস্থা, রেশন কার্ড, ত্রাণ সরবরাহ, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা, বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো, বাচ্চাদের অবসর কাটানো ও লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি, টয়লেট স্থাপন, পানির ব্যবস্থা, ড্রেনেজ সিস্টেমসহ প্রায় সব কিছুতেই অনেক শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে কলেরা, পোলিও ও হামের টিকা দেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি চুক্তি বা সম্মতিপত্র স্বাক্ষর হয়েছে গত বছরের ২৩ নভেম্বর। সে স্মারক অনুযায়ী এ মাসেই প্রত্যাবাসনের কাজ শুরু হওয়ার কথা। আমরা তাদের কাছে, জানতে চেয়েছি, তারা রাখাইনে ফিরে যেতে চায় কিনা। বেশিরভাগই বলেছে, তারা আর সেখানে ফিরতে চায় না। আর মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই প্রত্যাবাসন চুক্তির কথা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা জানান, এ ব্যাপারে তারা বিশেষ কিছু জানে না। জানতে চায়ও না!

উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালীর নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পগুলোতে যখন যাই, তখন বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। নতুন বছরের ১ থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল থেমে থেমে বৃষ্টি। অসময়ের এই বৃষ্টির কারণে তাঁবুতে সৃষ্টি হয় নানা ধরনের সমস্যা ও দুর্ভোগ। দুর্গন্ধ ও কাদা পানিতে সয়লাব ক্যাম্পগুলোয় এখনও নানা অব্যবস্থাপনা রয়েছে। ত্রাণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনও কেউ কেউ বঞ্চিত রয়েছে। কেউ কেউ বাগিয়ে নিয়েছে একাধিক রেশন কার্ড। ফলে কারও কাছে চাল-ডাল-তেলের মজুদ আছে। কেউ এখনও কোনও ত্রাণই পাননি। মিয়ানমারের মংডু ও বুছিদং থেকে আসা নূরকামাল, সিতারা বেগম, মোহাম্মদ করিম, মোহাম্মদ ইউসুফ, কামরুন্নেসা, সদরুল আলম, কুল্লা মিয়া, রহিমা খাতুনসহ বিপুল সংখ্যক মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তাদের প্রত্যেকের প্রায় একই কথা—‘প্রয়োজনে বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপ দিয়ে মরবো তবু বর্মায় আর ফিরে যাবো না।’

 

তবে পুরুষদের মধ্যে যারা একটু কম বয়সী, তারা বলেছেন অনেক শর্তের কথা। তাদের মত হচ্ছে—‘আমাদের রোহিঙ্গা মুসলিম হিসেবে আলাদা নাগরিকত্ব দিতে হবে। আমাদের জন্য মিয়ানমারে স্বাধীনভাবে থাকার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ করে মগ-মুসলিম পরখ না করে সম-অধিকারে বাঁচার সুযোগ দিতে হবে। মিয়ানমারের সব জায়গায় চলাফেরার সুযোগ দিতে হবে।’

 

মংডু থেকে আসা নূরকামালকে (৪৭) বসে থাকতে দেখা যায়, কুতুপালংয়ের একটি অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ছোট্ট তাঁবুতে। বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি। তাঁবুর একদিক দিয়ে ভেতরে পড়ছে বৃষ্টির পানি। বৃদ্ধা অসুস্থ মা, স্ত্রী আর চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে অলস বসে আছেন নূরকামাল। ঘরের এক কোণে ২ কেজি পরিমাণ আলু ও তিন চারটি পেঁয়াজও দেখা যায়। বেলা তখন প্রায় তিনটা। দুপুরের খাবার হয়েছে কিনা, নাকি রান্নার প্রস্তুতি শুরু হবে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুপুরে কেউই খাই না, সকালে কোনোরকম খেয়েছি আবার খাবো রাতে। তিন বেলা খাওয়ার মতো চাল-ডাল নেই। আগে ১৫ দিন অন্তর অন্তর ত্রাণ দেওয়া হতো। এখন মাসে একবার দেওয়া হয়। সেখানেও ঘাটতি রয়েছে। সর্বশেষ ত্রাণ দেওয়া হয়েছে একমাস তিনদিন আগে। কবে ত্রাণ পাবো, কেউ বলছে না।’

 

শক্তসামর্থ্য এই ব্যক্তি আরও বলেন, ‘আমি মিয়ানমারে সেলাই কাজ করতাম। মোটামুটি চলে যাচ্ছিল সংসার। তবে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কখনও যেতে পারতাম না। ছেলেমেয়েদের মক্তবে পড়ানো ছাড়া কোনও স্কুলে পড়ানোর সুযোগ পেতাম না। আকিয়াব, রেঙ্গুন—এসব শহরের নাম শুনেছি শুধু, কখনও দেখার সুযোগ হয়নি। আমাদের দেশের শহর, অথচ আমরাই এসব এলাকায় যেতে পারি না। এসব নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হলে আমরা মিয়ানমারে আর যাবো না। মরতে হলে এখানেই মরবো।’

 

বুছিদংয়ের ওয়ালিং পাড়া থেকে আসা সিতারা বেগম (৪২) জানান, তার ছেলেমেয়ে রয়েছে পাঁচ জন। দু’জনের জ্বর সর্দি। ঘরে বা তাঁবুতে চাল-ডাল, লাকড়ি কিছুই নেই। তারপরও এখানে প্রাণটা নিয়ে বেঁচে থাকা যায়—এটাই বড় পাওনা। এ অবস্থায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান কিনা—এমন প্রশ্নে আনোয়ারা বলেন, ‘যাইতম ন, বেশি জুলুম চলের। এ অবস্থাত আঁরা যাইল মারি ফেলাইবু মগঅল। তারতুন এড়ে মরিজন ভালা’ (যাব না, সেখানে বেশি জুলুম চলছে। এখন আমরা গেলে মগরা মেরে ফেলবে। তার চেয়ে এখানে মারা যাওয়া ভালো)।

 

মংডু থেকে আসা মোহাম্মদ ইউসুফ (৫৪) তার ৭ বছরের গুলিবিদ্ধ মেয়ে উম্মে হাবিবাকে দেখিয়ে বলেন, ‘এই নিষ্পাপ মেয়েটির কী অপরাধ ছিল? তাকে মিয়ানমারের হুকুমত (সেনাবাহিনী) গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছে। তারপরও আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু আমাদের রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সব কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ দিলে আমরা চলে যাবো।’

 

কুতুপালংয়ে নতুন ক্যাম্পে ৫ মাস আগে মংডুর উকিলপাড়া থেকে এসেছেন কামরুন্নেসা নামে এক ৬১ বছর বয়সী বৃদ্ধা। তার সঙ্গে তিন ছেলেও তাদের স্ত্রী ও নাতি-নাতনি মিলে ১৭ জন। দু’টি তাঁবু গেড়েছেন কুতুপালং ও বালুখালী সীমানা ঘেঁষে দুই পাহাড়ের পাদদেশে। সেখানে কথা হয় বৃদ্ধার সঙ্গে। তিনি জানান, মংডু এলাকায় বর্মিজ আর্মি আর মগেরা গণহত্যা চালিয়েছে। এক থানাতেই অন্তত দেড় দুই লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে যাওয়ার চেয়ে মুসলমান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে মরাই ভালো।

 

একই ক্যাম্পে সদরুল আলম নামে আরেক রোহিঙ্গা মাওলানার সঙ্গে কথা হয়। তিনিও এসেছেন মিয়ানমারের মংডু থেকে। সেখানে মগ আর সেনাবাহিনীর দ্বারা মুসলিম রোহিঙ্গাদের হত্যাযজ্ঞের বাস্তব সাক্ষী ছিলেন তিনি। নিজেও মৃত্যুর হাত থেকে কোনোমতে রক্ষা পেয়েছেন। সদরুল আলম জানান, ওই দৃশ্য দেখার পর আর কেউ সেখানে ফিরে যাবে, এটা ভাবাও যায় না। কারণ, সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে মংডু আর বুছিদংয়ে। চোখের সামনেই কচু কাটার মতো লাশ দেখেছি। বুছিদংয়ে অন্তত দেড় থেকে দুই লাখ মুসলিম রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। এরমধ্যে বড় অংশই যুবক-যুবতী। এতকিছুর পরও আমি জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চাই, যদি আমাকে প্রাপ্য অধিকার দেওয়া হয়। রোহিঙ্গা মুসলিম হিসেবে পরিচয় পাই। নিজেদের ধন সম্পদসহ সব কিছুই ফিরে পাই।

 

মিয়ানমারের মংডু জেলার বলিবাজার থেকে আসা কুল্লা মিয়া মিয়ানমারে নির্মমতার বর্ণনা তুলে ধরেন এভাবে, ‘আমার চোখের সামনে আমার বড় ছেলে শহীদ হয়েছে। তাই এক কাপড়ে চলে এসেছি। ছেলেটারে দাফনও করতে পারিনি। আর কোনোদিন ফিরতে পারব কিনা, জানি না। ফেরার ইচ্ছাও নেই।’

 

৭ মাস আগে ১৩ জন সদস্য নিয়ে আসা মোহাম্মদ করিম বলেন, ‘মুসলমান দেখলেই মগরা কেটে ফেলছে। সেনাবাহিনী গুলি করে মেরে ফেলছে। সেখানে যখন থাকতে পারছি না, তখন মুসলিম দেশে এসেছি। মরতে হলে এখানেই মরব।’

 

কৃষিকাজ করতেন বুচিডং টংবাজার এলাকার রফিক মিয়া। আগের কোনও সংকটের সময়ই তিনি বাংলাদেশে আসেননি। কিন্তু এবার টিকতে পারেননি। নির্যাতনের মাত্রা ভয়াবহ হওয়ায় পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, তার জন্মভূমিতে ফিরতে চান তিনি, তবে তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। বাঁচার সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় তিনি মিয়ানমারে আর ফিরে যাবেন না।

 

একই এলাকার বয়োবৃদ্ধ আলী হোসেন অবশ্য ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালে সংঘাতের সময়ও বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন। দু’বারই এনজিওর সহযোগিতায় নিজ দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। তবে এবার ফিরে যেতে হলে সব সুযোগ-সুবিধার গ্যারান্টি পেলেই যাবেন। তাদের ভোটের অধিকারও ফিরে পেতে চান। এ ছাড়া কোনোভাবেই মিয়ানমার ফিরে যেতে চান না বলে জানান তিনি।

 

চারদিনে বিভিন্ন ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে কথা বলেছি নানা বয়সী প্রায় দুই শতাধিক নারী-পুরুষের সঙ্গে। তারা কেউই আর সেখানে ফিরে যেতে চান না। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে তারা জানান, প্রয়োজনে তারা বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে, কিন্তু মিয়ানমারে আর ফিরে যাবে না। সেখানে ফিরে যাওয়ার অর্থ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা।

 

রোহিঙ্গাদের ভাষ্য, সহায়-সম্বল, ঘরবাড়ি, আত্মীয়স্বজন হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তারা। মিয়ানমারে ফিরতে হলে শূন্য হাতেই ফিরতে হবে তাদের। বাংলাদেশ সরকার ফিরে যেতে বাধ্য করলে তারা বাংলাদেশের মাটিতেই মরবে। তবু সেখানে ফিরে যাবে না।

 

বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা তাদের জাতিগত রোহিঙ্গা পরিচয়েই নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়। তাদের সব নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। চায় নির্ভয়ে বেঁচে থাকার পরিবেশ। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, নির্যাতন ও লুটপাটের মতো মানবতাবিরোধী সব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আন্তর্জাতিক আইনে বিচার চায় তারা। এসব ব্যাপারে যদি গ্যারান্টি দেওয়া হয়, তাহলেই কেবল তারা ফিরবে! জিজ্ঞেস করেছি, এই গ্যারান্টি কে দেবে? বলেছে– জাতিসংঘ! কিন্তু ওদেরকে বোঝাবে, জাতিসংঘ আজ পর্যন্ত নিজের আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া কোনও জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু ত্রাণ সহায়তা ছাড়া আর কিছুই দেয়নি, দিতে পারেনি!

লেখক: কলামিস্ট। বাংলাট্রিবিউন

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে