‘গ্রীক সভ্যতা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হল কিভাবে?”

মিলি সুলতানা : ‘গ্রীকপুরাণে যে অসভ্যতা আছে, সেটা কি আমরা ভুলে গেছি? গ্রীক সভ্যতায় নারী জগতে চরম বিশৃঙ্খল এবং ভাঙ্গনের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসটির প্রমাণ মিলেছে। বিশ্বখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস বলেন, ‘Woman is the greatest  source of chaos and disruption in the world’ ‘নারী জগতে বিশৃংখল ও ভাঙ্গনের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস’। গ্রীস ধর্মে নারীরাই হলো শয়তানের প্রতিভু। এবং গ্রীস সভ্যতায় নারী জাতিকে বিশৃঙ্খল ও ভাঙ্গনের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস বলা হতো। নারীদের অধঃপতিত চারিত্রিক মান, তাদের বেশভূূষা, নগ্নতা, সিগারেট  পানের ক্রমবর্ধমান অভ্যাস এবং পুরুষদের সাথে আবাধ মেলামেশা প্রভৃতি কারণে অস্নীলতার ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এই তিনটি কারণই রোম ও গ্রীসে বিদ্যমান ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বায়নের যুগে অশ্লীলতার এই নিয়ামকগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের আত্মহননের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গ্রীকদের মধ্যে ক্রমশ প্রবৃত্তি পূজা ও কামোদ্দীপনার প্রভাব বিস্তার লাভ করতে লাগল এবং এই যুগে বেশ্যা-সম্প্রদায় এতখানি উন্নত মর্যাদা লাভ করল যে, ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল। বেশ্যালয় গ্রীক সমাজের আপামর-সাধারণের কেন্দ্র ও আড্ডাখানায় পরিণত হল। দার্শনিক, কবি, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও বিশেষজ্ঞ প্রভৃতি নক্ষত্ররাজি উক্ত চন্দ্রকে পরিবেষ্টিত করে রাখত। যৌনকর্মীরা কেবল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্মেলনে সভানেত্রীর আসনই গ্রহণ করত না। বরং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনাও তাদের সামনে  সম্পাদিত হইত। যেই সমস্ত সমস্যার সাথে জাতির জীবন-মরণ প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট ছিল, সেই সকল ব্যাপারেও বেশ্যাদের মতামতকে চূড়ান্ত মনে করা হত। অথচ তাদের বিচার-বিবেচনায় কোন ব্যক্তির উপর কস্মিনকালেও সুবিচার করা হত না। সৌন্দর্যপূজা গ্রীকদের মধ্যে কামাগ্নি প্রবলাকারে প্রজ্বলিত করে দিল। যেই প্রতিমূর্তি অথবা শিল্পের নগ্ন আদর্শের প্রতি তারা সৌন্দর্য লালসা প্রকাশ করত। সেটাই তাদের কামাগ্নির ইন্ধন যোগাতে লাগল। গ্রীসের মত বিশ্বের অন্য কোথাও একই সময় একসাথে এত পন্ডিত ব্যাক্তির আবির্ভাব ঘটেনি। ভাষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, স্থাপত্য,শিল্পকর্ম, চিকিৎসাবিজ্ঞান,গণিতসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গ্রীকদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ন অবদান। কিন্তু গ্রীসের প্রতিটি নগররাষ্ট্রের মধ্যেই স্বৈরাচারী ও গণতান্ত্রিক মতবাদ নিয়ে সংঘর্ষ লেগেই থাকতো। যার কারনে নগররাষ্ট্রগুলো পতনের দিকে ধাবিত হয়েছিল।
গ্রিক দেব-দেবীদের অবাধ যৌনাচার নিয়ে বহু ইতিহাস আছে। জিউস ও তার স্ত্রী হেরা কিন্তু একই মায়ের গর্ভজাত সন্তান। জিউস তারই আপন বোন ডিমিটার এবং হেরাকে নিয়ে করেন। জিউসের মেঝোভাই হেডিস বহুত কাহিনী করে যৌন লালসার চূড়ান্ত করে আপন ভাতিজি জিউসেরই মেয়ে পার্সিফোনকে বিয়ে করেন। দেবতা জিউস নিজেও নিজের সহোদর বোন ডিমিটার এর সাথে অবৈধ প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েন এবং সে প্রণয়ের ফলেই দেবী পার্সিফোনের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন পাতালপুরীর রাণী।
দেবতা জিউসের অসংখ্য স্ত্রী ছিল। এদের মধ্যে দুই সহোদর বোন ডিমিটার ও হেরাও ছিল। তিনি তার সহোদর বোন হেরার রূপে মুগ্ধ হয়ে তার সাথে সঙ্গম করার জোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত তিনি একটা কোকিলের রূপ ধারণ করে শীতার্ত হয়ে অসুস্থ অবস্থায় হেরার সামনে গিয়ে পড়েন। হেরা দয়াদ্রচিত্তে কোকিলটিকে হাতে তুলে নেন। গরম করে সুস্থ করার জন্য তার বুকের মধ্যে কোকিলটিকে চেপে ধরেন। এভাবে তিনি কোকিলটিকে উত্তপ্ত করে সুস্থ করার চেষ্টা করেন। এ সময়ে জিউস স্বরূপে ফিরে আসেন এবং বোন হেরাকে ধর্ষণ করেন। এ লজ্জা থেকে রক্ষা পাবার জন্য হেরা জিউসকে বিয়ে করেন।
মেটিস, লেটো, ইউরাইনোম, ডাইওনি, থেমিস এবং ম্নেমোসিন এরা ছিলেন জিউসের স্ত্রী। এতগুলি স্ত্রী বর্তমান থাকার পরেও দেবরাজ জিউস অসংখ্য স্বর্গের দেবী এমনকি মর্তের নারীদের সাথেও অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার করে গেছেন। জিউসের সন্তান ডাইওনিসাস, হেলেন অব ট্রয় এবং হারকিউলেস মর্তের সুন্দরীদের সাথে তার অবৈধ প্রণয়ের ফসল। এ ছাড়াও তার আরও সন্তান ছিল যেমন; এ্যপোলো, এরিস, আরটিমিস, এ্যাথেনা, হেফায়েসটাস, হারমিস এবং আফ্রোদিতি। যে ভাবেই হোক এরা সবাই কিন্তু দেবতা এবং এদের প্রত্যেকের নারী-ঘটিত যৌন কু-কর্মের তালিকাও বিশাল। এই হল দেবতাদের কাছ থেকে শেখা যৌন নিয়ন্ত্রণের অবস্থা। দেবতারা যা কিছুই করুক-না-কেন সব জায়গাতে তাদের নারীভোগ চাই-ই।
ভাস্কর্য অপসারণের আন্দোলনে দল পাকানোর কি সুন্দর পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। মুন্নী সাহাদের বুকে যেন শেল বিঁধেছে। আমরা বাঙালিরা জাতি এখন  গ্রীকপুরাণ নিয়ে একটা ইভেন্ট খুলব। তারপর রাজপথ ও ফেসবুক গরম করব। শ্লোগান দেব মোমবাতি জ্বালাব। পৃথিবী উৎকৃষ্ট নিকৃষ্ট এমন কোন নেই যা আমরা পারি না। আমরা সবকিছু পারি। আমরা নিজেকে  জানার চেয়ে অন্যকে বেশি জানি। বুকের ব্যথা নিয়ে কতজন এখন শাহবাগে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে। শত শত লোকের প্রতিবাদ সমাবেশ। আসলে দুই আড়াই ডজনের বেশি নয় লোকসংখ্যা। ধিকি ধিকি আগুন জ্বলে –বুকের নদী বইয়া চলে…। পইলা আলোর মন বেজার হইয়া গেল। এত মনোবেদনা তারা সইব ক্যামতে?
লেখকঃ মিলি সুলতানা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট।
শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে