চার চারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি আমি

(সাংবাদিক শাহীন রহমানের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া) মৃত্যুকে কি খুব কাছ থেকে দেখেছি আমি, মাঝে মাঝে ভাবি আমি সেটাই ! কম করে হলেও চার চারবার আমি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি ! তাহলে কি পঞ্চম বারে মৃত্যু আমার জন্য অপেক্ষা করছে ? মাঝে মাঝে ভাবি ! একা একা ভাবি ! ৭৩ সালের কথা ! বাবার চাকরির সুবাদে আমরা তখন সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার বাসিন্দা ! নদীর ওপারে আশাশুনি, এপারে চাপড়া গ্রাম ! আমরা চাপড়া গ্রামে থাকি ! একদিন ভর দুপুরে ঘুরতে ঘুরতে পুকুরে পড়ে গেলাম ! আমার বয়স তখন সাত কি আট ! সাতার জানিনা ! কোথা থেকে শরিফা নামে এক মহিলা পুকুরে ঝাপ দিয়ে আমায় বাঁচালো ! সবাই মিলে আমার পেট থেকে পানি বের করলো ! দু চার মিনিট দেরি হলে আমি বাচতাম না, ওই সময়ে উপস্থিত সবাই সেটা বলেছে ! শরিফা আপা এখন সাতক্ষীরা শহরেই থাকে ! ভাল আছেন উনি, উনার সংসার নিয়ে ! ২য় ঘটনাটাও খুব আজব ! ৭৬ সালের কথা ! বাবার মারের ভয়তে আমি বাসার সিঁড়ির নীচে প্রায় সন্ধার পর দেড় ঘণ্টা লুকিয়ে ছিলাম ! মা বাসায় আসলে মায়ের সাথে বাসায় উঠেছিলাম, পরদিন ওই সিঁড়ির নীচ থেকে তেরটি সাপ ও সাপের বাচ্চা উদ্ধার হয়েছিল ! এটা ছিল যশোর জেলার কেশবপুরের ঘটনা ! দুটি ঘটনাই ছিল আমার শৈশবের ! ২০০৪ সাল ! চাপাই-নবাবগঞ্জে একটা কনসার্টের আয়োজক ছিলাম আমি ! ঢাকা থেকে অনেক শিল্পী নিয়ে গেছিলাম ! সিংগার মমতাজ, রবি চৌধুরী, ফিল্মের ওমর সানি,সোহানা আরও অনেকে ! কুয়াশার রাত ! দুই হাত সামনে দেখা যায়না ! আমি আর মমতাজ মাইক্রোতে পাশাপাশি বসা ! মমতাজের আপন ভাইপো গাড়ী চালাচ্ছে ! ১০০ / ১২০ স্পীডে গারি চলছে, হঠাৎ চালক নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলল ! ৬ / ৭ ঘুল্লি দিয়ে গাড়ি ১৫ থেকে ২০ হাত দূরে ছিটকে পড়লো ! যে এক্সিডেন্ট হয়েছিল, সেই এক্সিডেন্ট থেকে কেউই জীবন নিয়ে ফিরে আসে না ! অলৌকিক ভাবে জীবন ফিরে পেয়েছিলাম আমরা ! সারা শরীরে গাড়ির গ্লাসের ভাঙ্গা ভাঙা টুকরা ঢুকে গিয়েছিল ! আমি ৬ মাস বিছানায় চিকিৎসাধীন ছিলাম ! দু বছর পর চীন মৈত্রী হলে একটা প্রগ্রামে মমতাজ আপার সাথে দেখা ! গ্রিন রুমে আমি পিছন দিক দিয়ে মমতাজ আপা কে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম, মমতাজ আপা তো রীতিমতো চমকে উঠলেন, উপস্থিত মিউজিসিয়ানরা ছুটে এলো ! আমি পিছন দিক থেকে মমতাজ আপার কানে চুপ করে বললাম, আমি আর আপনি একই দিনে জন্মেছি, আমাদের জন্ম রাজশাহী হাইওয়েতে ! মমতাজ আপা হেসে দিলেন, ওদের বললেন, ওরে ও শাহিন, আমার ভাই ! আমরা একই দিনে জন্মেছি। মমতাজ আপা পরে এম পি হয়েছেন ! তার মানিকগঞ্জের জয়নগর গ্রামের বাড়ি আমি আমার ওয়াইফ, বাচ্চা গিয়েছি ! অসম্ভব আদর যত্ন করেছেন আপা ! আমায় এখনও আদর করেন আপা নিজ ভাইয়ের মত ! ভাল থাকবেন মমতাজ আপা ! চতুর্থ ঘটনাটা আরও মর্মান্তিক ! ২০০৮ এর প্রথম দিকের ঘটনা ! আমার এক বন্ধু বরিশাল শহরে কাস্টমস কর্মকর্তা ! প্রায়ই আমায় যেতে বলেন ! রোজার মাস শুরু হলে একাই রাতের গাড়ীতে বরিশাল রওনা দিলাম ! রাতে সেহেরি খেলাম, আমার পাশেই মলম পার্টি বসা, টের পাইনি ! সেহেরি খাওয়ার আগে এটিএন বাংলার বিপ্লব ও যুগান্তরের মশিউরের সাথে কথা বলেছিলাম ! তবে শেষ কথা বলেছিলাম আমার ওয়াইফের সাথে ! সেহেরি খাওয়ার পর পরই তন্দ্রা মত চলে এসেছিল, ওই সময়ে পাসের সিটে বসা লোকটি বলল, ভাই পানি খাবেন না ! ব্যাস তারপর আর কিছুই খেয়াল নাই ! বরিসাল বাস স্ট্যান্ডে ৪ / ৫ ঘণ্টা পড়েছিলাম, কল লিস্টের শেষ নাম্বার ছিল বিপ্লব ও মসিউরের ! বাস স্ট্যান্ডের লোকজন বিপ্লব ও মশিউরের সাথে ফোনে কথা বলেছিল, দুজনাই অদের বরিশাল ব্যুরো চীফ কে বলেছিল, আমার বউ একাই ছুটে গিয়েছিল বরিশাল ! খুলনা ও ঢাকা থেকে আত্মীয় স্বজন / বন্ধু-বান্ধব রা ছুটে গিয়েছিল ! আমি সব জেনেছিলাম ৪ দিন পর ! ওই চার দিন আমার কোন হুঁশই ছিল না ! আমি বিপ্লব ও মশিউরের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব ! সাংবাদিকরা না বললে কিংবা আমার পরিচয় না পেলে আমি আরও দু/চার ঘন্টা হয়তবা বরিশাল বাস স্ট্যান্ডেই পড়ে থাকতাম, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতাম ! কাস্টমসের বন্ধুটি অফিস বাদ দিয়ে আমার পাশে দিন রাত পড়েছিলেন। আমার ছোট ভাই এলিনের কলিগরাও আমার সেবা যত্ন করেছে ! এই চারটি ঘটনাই আমার জীবনে সেরা ঘটনা। সো সাবধান শাহীন রহমান ! মৃত্যু তোমার আশে পাশেই রয়েছে !

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে