চাল, রেমিটেন্স ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নজর দিতে হবে : ড. আতিউর রহমান

গাজী খায়রুল আলম : পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির দেশের মধ্যে একটির নাম বাংলাদেশ। আর আমাদের যে চ্যালঞ্জগুলো হচ্ছে চালের দাম, রেমিটেন্স ও রোহিঙ্গা। এই বিষয়গুলোর দিকে ভালোভাবে নজর দিতে হবে। রেমিটেন্স কেন কম হচ্ছে, সেটি দেখতে হবে। আমাদের যারা বিদেশে আছে, তারা টাকা পাঠায় দুটি মাধ্যমে। একটি হচ্ছে ব্যাংক আর একটি হচ্ছে হুন্ডি। আমাদের ব্যাংক রেইটটি হুন্ডির কাছাকাছি রাখতে হবে। তাহলে কেউ হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাবে না। কারণ হুন্ডিতে টাকা পাঠালে রিক্স আছে, এটি সবাই জানে। বিদেশি শ্রমিকদেরও ভালো মন্দ খোঁজ খবর নিতে হবে। তাদের সমস্যাগুলো সরকার দেখলে তারা সরকারের প্রতি আন্তরিক হবে। আমাদের অর্থনীতিকে ২০১৮ সালের অর্থনীতির সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে আলাপকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এই সব কথা হবে।

ড. আতিউর রহমান বলেন, এবছর প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাবে। এরই মধ্যে পদ্মা সেতু, রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রো রেল প্রকল্প দ্রুতগতিতে চলছে। এগুলোতে কাঁচামাল লাগে। আর এই কাঁচামালগুলো ব্যক্তি খাতে আমদানি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই বছর আমদানি বেড়েছে। যার জন্য টাকার পরিমাণে ডলারের দাম বাড়ছে। এটির একটি সুযোগ আছে। এর ফলে এই অর্থবছরটি খুব চাঙ্গা থাকবে। সরকারের একটি ভালো সুযোগ আছে, তারা যদি জুন মাসে দেখাতে পারে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, তাহলে নির্বাচনে তারা একটি ভালো মেসেজ দিতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, যদিও এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। আইএমএফ বলছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশ। টিআরআই বলছে, ৭.২ শতাংশ হবে। কিন্তু আমার ধারণা, এটি সপ্তম পঞ্চবার্ষিকীর যে প্রক্ষেপণ করেছে সেই মতোই ৭.৪ শতাংশ হবে। কারণ, ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, দেশে আমদানি অনেক বেড়ে গেছে। আমদানির মধ্যে যন্ত্রপাতি আছে, কাঁচামাল আছে। এই আমদানি বাড়া মানে এগুলো বিনিয়োগ হবে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ গত বছর সামান্য ছিল। এই বছর ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। কারণ, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে ব্যক্তি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ে। সরকারি বিনিয়োগের মধ্যে আমরা কয়েকটি দৃশ্যমান দেখছি।

তিনি বলেন, এখন থেকে দেখতে হবে, আমাদের সঞ্চয় কত হচ্ছে। আমরা এখন বিনিয়োগ করি ২০ শতাংশ আর সঞ্চয় করি ৩০ শতাংশ। এখনো আমাদের সঞ্চয়ের হারটি বেশি আছে। এবছর আমার চাওয়া, বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের হার কাছাকাছি হবে। আর একটি ভালো লক্ষণ হচ্ছে, আমাদের যে ডেভেলপ পার্টনার জাপান, বিশ্বব্যাংক আমাদের প্রকল্প সহযোগিতার হার বাড়াচ্ছে। আমাদের একটি বড় অন্তরায় ছিল বিদ্যুৎ। সেটিও আমরা উন্নতি করেছি। বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়ার্ট। আর এখন উৎপাদন ১৫ হাজার মেগাওয়ার্ট। গ্যাস  আমাদের একটু কম আছে। সেটি আমদানি করতে হবে।

তিনি বলেন, একটি দিকে সমস্যা আছে, সেটি হচ্ছে সরকার রাজস্ব সরবরাহ কতটুকু করতে পারবে। ইতিমধ্যে এনবিআর বেশকিছু সংস্কার গ্রহণ করেছে, তার জন্য মনে হচ্ছে আয়কর বাড়বে। ভ্যাট আইন স্থগিত করার কারণে হয়তো এই দিকে কিছুটা কমবে। তবে সেটি পুষিয়ে নিতে হবে আয়করের মাধ্যমে। আমরা দেখেছি মানুষের মধ্যে সাড়া পড়েছে, আয়কর দেওয়ার জন্য। এটি ধারাবাহিক রাখতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়বে। রাজস্ব আয় বাড়লে বিনিয়োগের হার যে বাড়বে সেটি আমরা মোকাবিলা করতে পারব। একটি বিষয় হচ্ছে, সরকার ব্যাংক থেকে বেশি লোন নিচ্ছে না। চাইলে আমাদের ব্যাংক থেকে লোন নিতে পারে। কারণ আমাদের ব্যাংকগুলোর কাছে বেশ বড় অংকের লিকুইড আছে। এই বছর আবার নির্বাচনের বছর। আমাদের সমাজ যদি শান্ত থাকে। আমাদের রাজনীতি যদি শান্ত থাকে তাহলে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিক থাকবে। নির্বাচনে যারাই নতুন সরকার আসবে, তারা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি পাবে। তাই সব দল মিলে আমাদের জনগণকে বলতে হবে, কোন কোন দিকগুলো আমাদের অর্থনৈতিক শক্তি। সেটি যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমাদের জনগণকেও সেটির উপর আস্থা রাখতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থায়ও একটি পরিবর্তন আনা দরকার। মিনিমাম দুই বছরের একটি কারিগরি কোর্স চালু করতে হবে। যেন ছেলেমেয়েরা একটি কাজ শিখে বিদেশ যেতে পারে। আর মোবাইল ব্যাংকগুলো, যেমন বিকাশ, রকেট তাদের বিদেশে এজেন্ট দিতে হবে। তাহলে রেমিটেন্স আরও বাড়বে। রোহিঙ্গাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর রপ্তানি মাত্র গত অর্থবছরে ১.৭ শতাংশ বেড়েছে। এটি তেমন একটি ভালো দিক নয়। মাত্র আটটি পণ্য আমরা রপ্তানি করতে পারছি। তার মধ্যে বেশিরভাগ গার্মেন্টস পণ্য। আরও ৪ হাজার উদ্যোক্তা আছে, তারা ১০ লাখ ডলারের বেশি রপ্তানি করেন । গার্মেন্টেসে যে সমস্ত সুবিধা দেওয়া হয়, সেই সুবিধাগুলো তাদের দিলেও রপ্তানি আয় বাড়বে। ছোট ছোট শিল্পগুলোকে প্রসারিত করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে আইন কানুন আছে, সেগুলো আরও সহজ করতে হবে। যেন বিনিয়োগকারীরা কোনো বাধার সম্মখীন না হয়। আরও একটি দিক হচ্ছে পরিবেশের দিকটি খেয়াল রেখে শিল্পায়ন করা। আমরা যে পণ্য তৈরি করছি, সেটি যদি পরিবেশ সম্মত হয়, গ্রিন হয়। তাহলে বিদেশে যারা এই দেশ থেকে রপ্তানি করে তারা যদি জানে এই পণ্য তৈরি করতে পরিবেশ নষ্ট হয়নি। এ পণ্য পরিবেশ সম্মত। তাহলে তারা দুইটাকা বেশি দিয়ে হলেও নিবে। তাই আমাদের সেরকম একটি সবুজ প্রবৃদ্ধির দেশ হতে হবে। আমি এটির উদ্যোগ নিয়ে ছিলাম। ২০০ কোটি টাকার একটি সবুজ অর্থায়ন চালু করেছিলাম। আরও ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি মুদ্রার ফান্ড তৈরি করেছিলাম। সেই ফান্ডটি বিভিন্ন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ব্যয় হওয়ার কথা। আমাদের এসএমই সেক্টরেও এরকম নজর দেওয়া উচিত। সব মিলিয়ে আগামী বছর অর্থনীতি চাঙ্গা অবস্থায় পৌঁছবে।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে