ঢাকায় মোবাইল ছিনতাই চক্র ও কিছু বিনীত পরামর্শ

ডঃ  শোয়েব সাঈদ : সেনা-মালঞ্চে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিলাম।  রাত সাড়ে দশটায় ক্যান্টনমেন্টের জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে বের হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পার হয়ে  সিগন্যালের জ্যামে আটকে গেলাম।  বিশাল জ্যাম, হকাররা গাড়ীর আশে পাশে ঘুরঘুর করছিল। গাড়ী জানালা এক তৃতীয়াংশ খোলা ছিল। আইফোনটি বাম হাতে  হাঁটুর কাছে  ধরা ছিল। চোখের নিমিষে একটা চিকন  হাত জানালার খোলা অংশ গলিয়ে হাতে ধরা  মোবাইলটি  টান মেরে জ্যামের ভিড়ে উধাও হয়ে গেল।  এটি হল  ঢাকায় মোবাইল ছিনতাইয়ের  প্রতিদিনকার অসংখ্য ঘটনার একটি। স্মার্টফোন চুরি বিশ্বব্যাপী একটি সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপের পকেটমারের জন্যে কুখ্যাত  শহর বার্সেলোনা কিংবা অভিনব ছিনতাইয়ের শহর আমস্টারডাম সর্বত্রই মোবাইল চুরির ঘটনা  ঘটে। বিশ্বব্যাপী মোবাইল চুরির আর্থিক মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। তবে ঢাকায় মোবাইল ছিনতাইয়ের   বিষয়টি  বিচ্ছিন্ন ধরণের নয়, বেশ ভয়াবহ মাত্রার। একটি সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে প্রায় জিম্মি  হয়ে আছে জনগণ। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা  বাহিনীর  নানাবিধ ব্যস্ততায় মোবাইল চুরির ঘটনাগুলো  সেই “সামান্য ক্ষতির” মতই  দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ। এরই সুযোগে সিন্ডিকেটেড ক্রাইম গ্রুপের মত  মোবাইল চুরির সংঘবদ্ধ চক্রের বিস্তার ঘটছে।

এই চক্রে প্রাথমিক কাজটি অর্থাৎ ছিনতাই বা চুরির কাজটি করেন অভিজ্ঞ ছিনতাইকারী বা চোরেরা। হস্তগত হওয়ার পর দ্রুত মোবাইলটি চলে যায় আইটি বিষয়ে জ্ঞান আছে এমন একটি শিক্ষিত চক্রের হাতে। উচ্চ প্রযুক্তির আইফোনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট লক সিস্টেম থাকায় একবার বন্ধ হয়ে গেলে খোলা মুশকিল। ছিনতাইকারীরা চেষ্টা করেন যতটুকু সম্ভব খোলা অবস্থায় ফোনটি  আইটি চক্রের হাতে তুলে  দিতে। আমার ফোনটি  ছিল কর্পোরেট এন্টারপ্রাইজের  সিকিউরিটি সিস্টেমের অধীনে।  ছিনতাইয়ের পরপরই অফিসের সাথে যোগাযোগ করে  সিমটি ব্ল্যাকলিস্টেট করে দেই।  আইক্লাউডে  ঢুকে  ব্যবস্থা করি  যাতে আইফোনটি নেটওয়ার্ক কানেকশন পাবার সাথে সাথেই ডাটা মুছে  যায়। এই সব নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরও পুরোপুরো নিশ্চিত হবার সুযোগ নেই।  আইফোনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর  হ্যাকারদের টম এন্ড জেরীর  দোলাচলে কিছু অনিশ্চয়তা তো থেকেই যায়। তার প্রমাণ পেয়েছি  ছিনতাইয়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। একটি ফেক আইডি থেকে একজন আমার মেসেঞ্জারে নক করে জানতে চায় আইফোন হারিয়েছি কিনা।  সে আমার ফোন নাম্বারটি সঠিক বললেও পাসওয়ার্ড ভুল বলেছিল। দীর্ঘ আধঘণ্টার চেটে ফোনটি ফেরত দেবার চাইতে  সে বারবারই চেষ্টা করছিল আমার কাছ থেকে তথ্য নেবার বিশেষ করে এপেল আইডি বের করবার। বারবারই জানতে চাচ্ছিল ফোনের বক্সটি আমার কাছে আছে কিনা। বক্সে আইএমআইই নাম্বার থাকে সেটি জানলে  ফোনটি চালু করতে সুবিধে হয়। কথোপকথনের লেভেল দেখে নিশ্চিত বলা যায় ফোনটি পড়েছে পেশাদারের হাতে। আমার সাথে  যোগাযোগের অর্থ হল  কিছু বেসিক তথ্য ওরা পেয়েছে। সেটি কোন ফোনকল থেকে বা অফলাইনে আসা ম্যাসেজগুলো  থেকে বা অন্য কোনভাবে।

ইতিমধ্যেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর   সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছে এবং আইএমআইই  নাম্বার সহ তদন্তে সুবিধে হয় অনেক তথ্যই দেওয়া হয়েছে। এপেলে লগইন করে ফোনটি অফমোডে পাই। মুশকিল হল অফ থাকলে আইএমআইই নাম্বার দিয়ে ট্র্যাক করে ফলাফল পাওয়া যায় না।  পরবর্তীতে  এপেল সাপোর্টের নামে আমি কিছু মেইল পাই যাতে বলা হয়  ফোনটি লোকেট  করা গেছে  এবং আমাকে একটা লিঙ্কে ক্লিক করতে  প্রলুব্ধ করা হয়। এক নজরেই বুঝা যায় মেইলগুলো ফিসি এবং ক্লিক করা মানে ওদের ফাঁদে পা দেওয়া। ওদের শেষ চেষ্টা ছিল এপেলে একাউন্ট রিকভারীর অনুরোধ পাঠানো। এপেল থেকে আমাকে মেইল করা হয় তাতে দেখা যায় রিকভারী অনুরোধে যোগাযোগের জন্যে ঢাকার একটি ফোন নাম্বার দেওয়া  আছে। অর্থাৎ ছিনতাই হয়ে যাওয়া ফোনটির বাজার মুল্য বৃদ্ধির জন্যে আইক্লাউডে এক্সেস করা জরুরী এবং চক্রটি সে চেষ্টাই করে যাচ্ছে। আমার কাছে সবচেয়ে জরুরী ছিল আমার এড্রেস বুকটি আর ইমেইলগুলো। এন্টারপ্রাইজ ফোন হওয়া অফিস সার্ভারে সবই কপি করা ছিল তাই বড় ধরনের ঝক্কি থেকে বাঁচা গেছে।

মোবাইল ফোন ছিনতাইকারীরা কতটা বেপরোয়া তা  বুঝা যায় বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোবাইল বিক্রির  অনলাইনে বিজ্ঞাপনগুলো দেখে। এমন অসংখ্য বিজ্ঞাপন আছে   যাতে এমন কি আইফোন  ৬ কিংবা ৭ বা তার চেয়েও আধুনিক মোবাইল বিক্রির অফার দেওয়া আছে  মাত্র ১০-১৫ হাজার টাকায়। চার্জারবিহীন, বক্সবিহীন, ইয়ারফোনবিহীন,  আইক্লাউড  ব্লক বা লকড হয়ে আছে এমন সেট বিক্রির বিজ্ঞাপনগুলোই বলে দেয় সেটটির মালিকানা সন্দেহজনক বা চুরির মাল।  নজরদারীর অভাবে অনলাইনের এই বিজ্ঞাপনদাতারা  যোগাযোগের জন্যে ফোন  নাম্বার দিয়েও বহাল তবিয়তে থাকতে পারেন বলেই বিজ্ঞাপনের সাহস পান। ছিনতাই হয়ে যাওয়া একটি মোবাইল অনেক হাত বদল হয়। আসল ক্রিমিনালকে ধরা অনেকসময় সহজসাধ্য নয়। কমদামে শুধু সেটটি বিক্রির বিজ্ঞাপন যারা দেন তাদের ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা  বাহিনী  একটু খোঁজ নিলে কেঁচো খুজতে বিষাক্ত সাপের আস্তানাটিও বের হয়ে আসতে পারে। শোনা যায় এই চক্রটির নেটওয়ার্ক সীমান্তের বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত।

ভাল মানের মোবাইল ফোন  কোন ফ্যাশন নয়, জরুরী কমুডিটি। ব্যবসা বানিজ্য, চাকুরী আর কর্পোরেট  জগতে মোবাইল ফোনটি হচ্ছে জরুরী লাইফ লাইন। এটি  ছিনতাই/চুরি হলে যে বিড়ম্বনা, ক্ষেত্র বিশেষে যে মানসিক  ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় ভুক্তভোগী ছাড়া অনুভব করা কঠিন। এটি  কেবল  “সামান্য ক্ষতির”  বিষয় নয়, বড় ধরণের ব্যবসায়িক/ব্যাক্তিগত/মানসিক/কর্পোরেট আর আর্থিক ক্ষতির কারণও বটে। অনেক অভিবাসী বা বিদেশীরা মোবাইল এপ্স ব্যবহার করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার, অনলাইন  ব্যাংকিং করেন। মোবাইলটি ছিনতাই হলে বড় ধরণের বিপদে  ঘটতে পারে। ফোনটি ছিনতাই বা চুরি হলে  যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লস্ট মোডে দেওয়া  বা ডাটা মুছে ফেলার প্রক্রিয়াটি জানা থাকা ভীষণ জরুরী।

আগেই বলেছি মোবাইল চুরি ঘটনা বৈশ্বিক সমস্যা। তবে বাংলাদেশে এর মাত্রা অনেক ভয়াবহ এবং সম্ভবত একটি সিন্ডিকেটেড ক্রাইম গ্রুপ দ্বারা পরিচালিত। যে চুরি বা ছিনতাই করছে যে হয়তো মাদকাসক্তির জন্যে বা হাতখরচের  জন্যে কিছু টাকা পাচ্ছে, কিন্তু মূল নাটেরগুরুরা  আইটি শিক্ষায় শিক্ষিত।  এই সিন্ডিকেটটা  তো ভাংগতে হবে।  পুলিশের রুটিন কার্যক্রম দিয়ে এই ধরণের অপরাধ দমন সহজ নয়। একটু বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ টাস্কফোর্সের নজরদারীর মধ্যে রাখলে সফলতা আসতেও পারে।  আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি বিনীত পরামর্শ রইল।

সূত্র :আমাদের সময়.কম

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে