দিনে রিক্সা চালান সাইফুল রাতে পড়াশুনা করেন গ্রীন ইউনিভারসিটিতে….

ফারহানা মিথিলা : মনে হতে পারে এটি গল্প। আসলে এটি গল্প না একটি সত্য ঘটনা। ডাক নাম সাইফুল। তবে বাবা-মার দেয়া নাম মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। বাবা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, সদ্য অবসর নিয়েছেন। মা গৃহীনি। দুই ভাই-দুই বোনের মধ্যে সাইফুল ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। বড় ভাই আব্দুল মান্নান একটি এমপিভূক্ত কলেজেন প্রভাষক। দুই বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। সাইফুলের বাড়ি মানিকগঞ্জ সদরের উখিয়ারা গ্রামে। পরিবারের সবাই মানিকগঞ্জেই বসবাস করেন। সাইফুলের পড়াশুনাও মানিকগঞ্জে। মাধ্যমিক পড়েছেন মানিকগঞ্জ মডেল হাইস্কুলে। মাধ্যমিকে প্রথম শ্রেণীতে উর্ত্তীণ হয়ে মানিকগঞ্জ ছাড়েন সাইফুল। এরপরের ঘটনা অন্য। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকের সন্তান সাইফুলের ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে প্রকৌশলী হবে। সে ইচ্ছের বাস্তবায়ন ঘটাতে ভর্তি হন টাঙ্গাইল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এ। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে চলে আসেন ঢাকায়। মনে অদম্য ইচ্ছা নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। সংসারের হাল ধরবেন। মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবেন। সে লক্ষ্যে ঢাকায় জীবন সংগ্রাম শুরু করেন। ঢাকায় এসে চাকুরী নেন একটি গার্মেন্টের প্রকৌশলী বিভাগে। সততা ও দক্ষতা নিয়ে কাজ করেন সাভারের আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টস কারখানায়। প্রায় তিন বছর কাজ করেন সেখানে। কিন্তু বিধিবাম। কারখানার মালিক মাসিক বেতন নিয়ে গড়িমসি করতে থাকেন। প্রতি মাসেই তাকে নির্ধারিত বেতন দিতেন না। তারপরও মা-বাবার কথা চিন্তা করে কাজ করতে থাকলেন ঐ গার্মেন্টসটিতে। কিন্তু সাইফুলের তো অদম্য ইচ্ছা প্রকৌশলী হবার। দু’[চোখ ভরা স্বপ্ন তার। নিজের এবং বাবা-মায়ের স্বপ্ন তার পুরণ করতেই হবে। চাকুরী ছেড়ে দিয়ে চলে এলেন য়াকায়। ঢাকায় এসে ভর্তি হলেন গ্রীন ইউনিভারসিটির বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডিপ্লোমা কোর্সে। এটি ৩ বছরের কোর্স। প্রতি মাসে সেমিষ্টার ফি ৭ হাজার টাকা। মা-বাবাসহ পরিবারের কেউ জানেন না, সাইফুল গার্মেন্টস এর চাকুরীটা ছেড়ে দিয়েছেন। আর সাইফুলও ইচ্ছে করে জানাননি তার চাকুরী ছাড়ার খবর। কারণ সাইফুলকে তো তার স্বপ্ন পুরণ করতেই হবে। যেমন কথা তেমন কাজ। সেমিষ্টার ফি জোগাড় করার জন্য সাইফুল সারাদিন মিরপুর ১ নং এলাকায় রিক্সা চালান আর সন্ধ্যায় গ্রীণ ইউনিভারসিটিতে সান্ধ্যকালীন ক্লাশ করেন। হাড় ভাঙ্গা খাটুনীতেও সাইফুলের কোন দু:খ নেই। কারণ তার তো স্বপ্ন একটাই প্রকৌশলী হওয়া। আলাপচারিতায় সাইফুল গর্ব করে বল্লো, চুরি করছিনা,মানুষের পকেট মারছিনা,কর্ম করছি। আর কর্মের টাকা দিয়ে ভাল মানুষ হবার স্বপ্ন দেখছি। হয়তোবা বাবা-মার সামর্থ্য থাকলে রিক্সা চালিয়ে পড়াশুনার খরচ জোগাড় করতে হতো না। বাবা শিক্ষক হিসেবে সারাজীবন সৎভাবে জীবন-যাপন করেছেন, সৎ আয় করেছেন। বাবা এখন অবসরে আছেন তার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয় আমার পড়াশুনার খরচ চালানো। আল্লাহর উপর ভরসা করে আমি আয় করছি। আর সে আয় দিয়েই আমি আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। তবে সাইফুলের স্বপ্নের মধ্যে আরেকটি স্বপ্ন রয়েছে,বাস্তব জীবনে একজন বড় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হওয়া। কারণ তার জীবনের প্রথম চাকুরী ছিল গার্মেন্টস এ। গার্মেন্টস সর্ম্পকে তার সম্যক ধারনাও রয়েছে। ইতিমধ্যে টাঙ্গাইল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ৫০ সহপাঠী মিলে একটি সমিতি করেছেন। সমিতিতে তাদের ভালো একটি সঞ্চয়ও হয়েছে। এ সঞ্চয় দিয়ে সাভার কিংবা আশুলিয়া এলাকায় ছোট পরিসরে একটি গার্মেন্টস করতে চান তারা। সমিতির সবাই যেহেতু সহপাঠী সেহেতু তাদের মনোবলটাও অটুট। এ বছরের মধ্যেই তারা এ গার্মেন্টসটি করতে চান। সাইফুল বলেন, তার অদম্য ইচ্ছা শক্তিই তাকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তার মনে চাকুরী জীবনের যে যন্ত্রণা রয়েছে তা সে মোচন করতে চান। সাইফুল অবলীলায় বলেন, রিক্সা চালিয়ে সে আয় দিয়ে লেখাপড়া করে আমি প্রমাণ করে দিব মানুষ চাইলেই তার পক্ষে সব কিছু সম্ভব। তবে সেখানে ইচ্ছা এবং শক্তি ও আল্লাহর রহমত থাকতে হবে। ব্যক্তি জীবনে সাইফুল বিবাহিত এবং এক কণ্যা সন্তানের জনক। তার এ চলার পথে যদি কোন সহৃদয়বান ব্যক্তি এগিয়ে আসেন তাহলে সে তা গ্রহণ করবে শুধূমাত্র স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য। আমাদের সমাজে এমন অনেক সাইফুল আছেন যাদের একটু পৃষ্ঠপোষতা করলে তারা সমাজের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হতে পারেন।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে