দুর্গম পথের দুঃসাহসী যাত্রী

একজন যাত্রী, নিরুদ্দেশের যাত্রী নন, উদাস পথিক নন, তাঁর যাত্রার একটা লক্ষ্য ছিল, সেদিকেই তিনি চলেছিলেন, কিন্তু একপর্যায়ে তাঁকে থেমে যেতে হয়েছে। গন্তব্যটা ছিল ধ্রুব, কিন্তু দৈবক্রমে তিনি পতিত হয়েছিলেন নানাবিধ বিপদ-আপদে, যে জন্যে চলেছেন ঠিকই, এগিয়েছেনও অনেক দূর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে থামতে হয়েছে, বলা যায় থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। পথটা মোটেই স্বচ্ছন্দ ছিল না, ছিল অত্যন্ত দুর্গম, সেই পথে চলতে গিয়ে তিনি রীতিমতো রক্তাক্ত হয়েছেন; কিন্তু দুর্গম জেনেও তিনি ওই পথেরই যাত্রী ছিলেন, তাঁর পক্ষে ভিন্নপথে চলাটা ছিল অসম্ভব।

তাঁকে আমরা নানা পরিচয়ে চিনি; তিনি বিদ্রোহী ছিলেন, আবার ছিলেন প্রেমিকও; এক হাতে তাঁর বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য এই ঘোষণা তো নিজেই দিয়ে গেছেন। আরো অনেক ভূমিকা ছিল তাঁর, প্রায় রবীন্দ্রনাথের মতোই, যদিও রবীন্দ্রনাথের তুলনায় তিনি অবশ্যই অনেক পেছনে। রবীন্দ্রনাথ যে-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, ছবি এঁকেছেন, ভ্রমণ করেছেন বহুদেশ, সে-কাজগুলোও তিনি করতে পারেননি। সম্ভব ছিল না করা। তাঁর হাতে সময় অল্প, সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু তবু তিনি চলেছেন। কোন দিকে? এক কথায় বলতে গেলে বিপ্লবের অভিমুখে। তিনিই আমাদের প্রথম বিপ্লবী কবি। বিদ্রোহী নন, আসলে বিপ্লবী। সমাজ ও রাষ্ট্রে একটা বিপ্লব চেয়েছেন। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়, পৃথিবীটাকে সুন্দর করার জন্যে। সেজন্যেই তিনি একই সঙ্গে প্রেমিক ও বিদ্রোহী।

প্রতিরোধ ও ব্যঙ্গবিদ্রূপ নজরুলের কবিতায় এবং গদ্য রচনাতে অনেক বেশি তীব্র। এবং তা প্রধানত ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধেই, যেজন্যে নজরুলের লেখা রাষ্ট্রের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয়নি। তাঁর অনেক বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। এই বইগুলোর মধ্যে রয়েছে যুগবাণী (১৯২২), ভাঙার গান (১৯২৩), বিষের বাঁশি (১৯২৪), দুর্দিনের যাত্রী (১৯২৬), প্রলয়শিখা (১৯৩০) ও চন্দ্রবিন্দু (১৯৩১)। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবি ছিল স্বাধীনতার পক্ষের উপন্যাস, এবং সেখানে পথের যে-নির্দেশ ছিল সেটাও আপসরফার নয়, সশস্ত্র ‘বিপ্লবে’র। যেজন্যে সরকারের পক্ষে ওটিকে সহ্য করা সম্ভব হয়নি, উপন্যাসের বিতরণ, মুদ্রণ, সংরক্ষণ সবই তারা নিষেধ করে দিয়েছিল; যার ফলে গোপনে এবং হাতে লিখে পথের দাবি বিতরণ চলেছিল। কিন্তু শরৎচন্দ্রের শুধু একটি বই-ই বাজেয়াপ্ত হয়েছে, নজরুলের হয়েছে একে একে ছয়টি, কেবল তাই নয়, রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে কবির সশ্রম কারাদন্ড হয়েছে। এক বছরের ওপরে তিনি কারাবন্দি ছিলেন। দ্বিতীয়বারও তাঁর কারাদন্ডাদেশ হয়েছিল, কিন্তু সেটি কার্যকর হয়নি গান্ধী-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার দরুন। ব্রিটিশ রাজের জন্য এই কবি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে তিনি তুলনাবিরহিত। অন্যকোনো ভারতবর্ষীয় কবি সরকারকে এমনভাবে ক্ষিপ্ত করতে পারেননি।

১৯২৯-এ কাজী নজরুল ইসলামকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। সভায় সুভাষচন্দ্র বসু উপস্থিত ছিলেন। তাঁর বক্তৃতাতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব, তখনো তার গান গাইব।’ এ ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে তেমনি কারাগারে নজরুলের গান গাওয়া হয়েছে বইকি।

নজরুলের অনুরাগী, ভক্ত ও সমর্থকের সংখ্যা ছিল বিপুল। বিশেষ করে তরুণদেরকে তো তিনি অত্যন্ত উদ্বেলিত করে তুলেছিলেন। তিনি তাদের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিলেন। তাই বলে নজরুল যে কেবল যুগের হাওয়ায় পাল খাটিয়েছিলেন তা নয়, শিল্পী হিসেবে অবশ্যই তিনি ছিলেন কালোত্তীর্ণ। তাঁর রচনায় বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, সে-বক্তব্য বিপ্লবের পক্ষে, কিন্তু বক্তব্যকে তিনি মুখ্য করে তোলেননি, সেটি থেকেছে শিল্পের ভেতরেই এবং শৈল্পিক সৌন্দর্যের সঙ্গে একেবারেই অঙ্গীভূত অবস্থায়, যেজন্যে তাঁর আবেদন ছিল একাধারে ব্যাপক ও গভীর।

লেখক, প্রাবন্ধিক, ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘নজরুল ইসলামের সাহিত্য জীবন’ বই থেকে সংকলিত।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে