ধর্ষণের আলোচিত বছর ২০১৭

২০১৭ সাল শেষ হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। বনানীতে ২ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণসহ ধর্ষণের অনেক ঘটনার সাক্ষী এ বছরটি। চলতি বছরের ২৬ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানায়, ২০১৭ সালের প্রথম ১০ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৮৩৪টি। অন্যদিকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে ১৯৩টি। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের অভাব, পিতৃতন্ত্র ও বৈষম্যমূলক আইন নারী নির্যাতন বাড়ার পেছনে দায়ী।

২০১৭ সালের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা তুলে ধরা হলো-

বনানীতে দুই তরুণী ধর্ষণ
গত ২৮শে মার্চ রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী। ধর্ষণের অভিযোগে আপন জুয়েলার্সের একজন মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার দুই বন্ধুসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন দুই তরুণী। এর আগে ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর পুলিশের কাছে গেলে পুলিশ শুরুতে মামলাটি নিতে চায়নি।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ওইদিন রাতে হোটেলে ডেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই তরুণীকে ধর্ষণ করেন আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে শাফাত আহমেদ ও তাঁর বন্ধু নাঈম আশরাফ। গত ৮ জুন শাফাত আহমেদ, তাঁর বন্ধু নাঈম আশরাফ ওরফে আবদুল হালিমসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। অপর তিনজন আসামি হলেন শাফাতের বন্ধু সাদমান সাকিফ, গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও তাঁর দেহরক্ষী রহমত। বর্তমানে মামলাটির বিচার চলছে।

বগুড়ায় ছাত্রী ধর্ষণ
গত ১৭ জুলাই কলেজে ভর্তির বিষয়ে সাহায্যের নাম করে বগুড়ায় সদ্য এসএসসি পাস করা এক ছাত্রীকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার (বর্তমানে বহিষ্কৃত)। পরে স্থানীয় এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সহযোগিতায় উল্টো মেয়েটিকেই এ ঘটনার জন্য দায়ী করে এবং বিচারের নামে মা সহ মেয়েটিকে ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এরপর তাদের এলাকা ছাড়া করার জন্য এসিড মারার হুমকি দেওয়া হয়। ২৮ জুলাই দুপুরে তাদের চুল কেটে দিলে নির্যাতনের শিকার ওই মা-মেয়ে থানায় মামলা করেন। এরপর গ্রেফতার করা হয় চারজনকে।

চলন্ত বাসে আইন বিভাগের ছাত্রী রুপা ধর্ষণ
গত ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে ছোঁয়া পরিবহনের শ্রমিকদের হাতে ধর্ষণের শিকার হন ঢাকার আইডিয়াল ‘ল’ কলেজের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপা। পরে রুপার ঘাড় মটকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। মধুপুর থানার পুলিশ ওই রাতেই তাঁর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের পর বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করে। একইসাথে ওই থানার পুলিশ বাদী হয়ে মধুপুর থানায় হত্যা মামলা করে। এরপর ২৮ আগস্ট মধুপুর থানায় গিয়ে লাশের ছবি দেখে রুপাকে শনাক্ত করেন তার ভাই হাফিজুর রহমান।

পরে পুলিশ ছোঁয়া পরিবহনের চালক হাবিবুর (৪৫), বাসের তত্ত্বাবধায়ক সফর আলী (৫৫) এবং বাসচালকের সহকারী শামীম (২৬), আকরাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীরকে (১৯) গ্রেপ্তার করে। পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা রুপাকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। এরপর গত ৩১ আগস্ট রুপার লাশ টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থান থেকে উত্তোলন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাঁকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নিজ গ্রাম আসানবাড়িতে বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয়।

গাজীপুরে ১০ বছরের শিশু ধর্ষণ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুরে ১০ বছরের শিশু ধর্ষিত হয়। এ ঘটনা শুরুতে আলোচিত না হলেও ২ মাস পর বিচার না পেয়ে ওই শিশু মেয়েসহ চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তার বাবা। নিহতরা হলেন: উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের কর্নপুর (সিটপাড়া) গ্রামের মৃত মাহাম্মদ আলীর পুত্র হযরত আলী (৪৫) ও তার পালিত কন্যা আয়েশা আক্তার (১০)। ঘটনায় ৩০ এপ্রিল ঢাকার কমলাপুর জিআরপি থানায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন নিহত হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম। ২৭ মে মামলার প্রধান আসামি মো. ফারুককে (৩০) গ্রেফতার করে র‌্যাব-১। এর আগে গ্রেফতার করা হয় আরও ২ জনকে।

নিহত হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম জানান, ২ মাস আগে একই এলাকার ফজলুল হকের পুত্র ফারুক শিশু আয়েশাকে তার বাড়ির পাশ থেকে সাইকেলে করে গভীর বনে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এসময় ফারুক ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে তাকে মারপিট করে আহত করে। এ ঘটনায় হালিমা বাদী হয়ে তাত্ক্ষণিক শ্রীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করলেও শ্রীপুর থানার এএসআই বাবুল মিয়া ঘটনাটি মোটা টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এছাড়া বিষয়টি মিমাংসা করার জন্য হালিমাকে হুমকি ও মামলার ভয় দেখিয়ে নিরুত্সাহিত করার চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় মেম্বার আবুল হোসেনের যোগসাজসে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হলে হালিমা শ্রীপুর থানায় ১৫/২০বার গিয়েও মামলা করতে ব্যর্থ হন। এ ঘটনায় কোন বিচার না পাওয়ায় হালিমার স্বামী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

এরপর ফারুকসহ আরো কয়েকজন তার মেয়ে আয়েশাকে অপহরণ করে তুলে নিয়ে যায় এবং পূর্বের ঘটনা মিমাংসা করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে আয়েশা কৌশলে তাদের কাছ থেকে পালিয়ে রক্ষা পায়। এ ঘটনায় ঐ দিন বিকেলেই হালিমা আবার থানায় অভিযোগ করতে গেলে থানার ডিউটি অফিসার ও ওয়্যারলেস অপারেটর অভিযোগ না নিয়ে তাকে অপমান করে থানা থেকে বের করে দেয়। একদিকে মেয়ে নির্যাতনের বিচার না পাওয়া এবং আরেকদিকে মেয়েকে অপহরণের চেষ্টা ও মিমাংসার জন্য চাপ সৃষ্টি করায় রাগে, ক্ষোভে, লজ্জা ও ঘৃণায় মেয়েকে নিয়ে হালিমার স্বামী একত্রে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

চট্রগ্রামে চার নারী ধর্ষণ
গত ১২ ডিসেম্বর গভীর রাতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়নের এক বাড়িতে ডাকাতির সময় তিন প্রবাসীর স্ত্রী ও তাদের এক বোনকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তাদের একজন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ধর্ষিতারা থানায় মামলা করতে গেলে কর্ণফুলী থানা পুলিশ তাদের পটিয়া থানায় যেতে বলে, পটিয়া থানা পুলিশ বলে কর্ণফুলী থানায় মামলা করতে। এক সপ্তাহ গড়িমসি করেও মামলা না নেয়ায় আনোয়ারা থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় এমপি ভূমিপ্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদের নির্দেশে কর্ণফুলী থানা পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য হয়। পরে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে তোলপাড় পড়ে যায়। পুলিশও তৎপর হয়ে ওঠে।

ভিকটিমদের কয়েক দফা পরীক্ষা করা হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ওই নারীদের ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। সর্বশেষ রিপোর্টেও ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। মামলার পর ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে মোহাম্মদ সুমন ওরফে আবু (২৩) ও কালু নামে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।

বিডি২৪লাইভ

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে