‘পহেলা বৈশাখ ইলিশের নয়’

তামান্না মোমিন খান :পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত আর ইলিশ এ যেন নগর সংস্কৃতির একটি অংশ। প্রতি বছর ১লা বৈশাখকে পুঁজি করে ইলিশ নিয়ে চলে জমজমাট ব্যবসা। বৈশাখকে সামনে রেখে ইলিশের দাম হয়ে যায় আকাশচুম্বী।  অথচ ১লা বৈশাখের ইতিহাস কিংবা ঐতিহ্য খুঁজে কোথাও ইলিশের সঙ্গে বৈশাখের  কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায় না। সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। আর বছরের প্রথম দিন পহেলা  বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। তখনকার সময় প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। বর্তমানে ১লা বৈশাখে ইলিশকে ঘিরে যে নগর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেটি তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে ইতিহাসে কোথাও ১লা বৈশাখের সঙ্গে ইলিশ মাছের সম্পৃক্ততা নেই। এ বিষয়ে বাংলা একডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন- ১লা বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আগে গরিব কৃষকরা তাদের ফসল বিক্রি করে খাজনা দিতো। যেহেতু বৈশাখ মাস ইলিশের মৌসুম নয়। তাই এসময়টি ইলিশের দাম সবসময় চড়া থাকে। তখনকার গরিব কৃষকরা কখনই ১লা বৈশাখে ইলিশ কিনে খেতে পারতো না। গত কয়েক দশক ধরে ১লা বৈশাখকে ঘিরে যে ইলিশ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা উচ্চবিত্তের তামাশা ছাড়া আর কিছুই না।  এখনও দেশের বেশির ভাগ মানুষ ১লা বৈশাখে ইলিশ কিনে খেতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন- এদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয় ষাটের দশকে। সে সময় ছায়ানট রমনা বটমূলে প্রথম বৈশাখী গান শুরু করে। এর আগে আমাদের নববর্ষের সংস্কৃতিতে ছিল হালখাতা। বছরের প্রথম দিন  নতুন হিসাব বই খোলা হয়। আমরা দেখেছি হালখাতার দিনে  দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টি, লুচি ও সবজি দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকতো। অথচ এখন হালখাতার সংস্কৃতি উঠে গিয়ে ইলিশ সংস্কৃতি চালু হয়েছে। গ্রামেগঞ্জে এখনো কিছু হিন্দু দোকানদার হালখাতা করে থাকে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই  হালখাতা উঠে গেছে। আর ইলিশ নিয়ে যে বিলাসিতা করা হয় তা শুধুমাত্র নাগরিক সংস্কৃতির একটি অংশ। ১লা বৈশাখকে সামনে রেখে ইলিশ নিয়ে যেন কোনো কারসাজি ব্যবসায়ীরা করতে না পারে সেজন্য সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন। এদিকে পহেলা বৈশাখের খাবার তালিকায় ইলিশ মাছ না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত মঙ্গলবার ভারত সফর নিয়ে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “পহেলা  বৈশাখে কেউ ইলিশ খাবেন না। ইলিশ ধরবেন না। খিচুড়ি খাবেন, সবজি খাবেন, মরিচ পোড়া খাবেন, ডিমভাজি খাবেন।” এখন ইলিশের বড় হওয়ার মৌসুম। জাটকা সংরক্ষণের জন্য ১লা মার্চ  থেকে ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সব নদীতে ইলিশ ধরা, মজুত ও পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে সরকার। গত বছরও প্রধানমন্ত্রীর  সরকারি বাসভবন গণভবনে পহেলা  বৈশাখের আয়োজনে ইলিশ ছিল না।সূত্রঃ মানবজমিন

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে