বিপদে সহায় ৯৯৯

উত্তরা থেকে বাসে খিলক্ষেতের দিকে যাচ্ছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ইসরাতুল মুন্তাহা। লা মেরিডিয়ান হোটেলের সামনে দেখলেন একজন বৃদ্ধ পথচারী রাস্তা পার হচ্ছেন। হঠাৎ একটি বাস এসে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। ঘটনাস্থলে বৃদ্ধ লোকটিকে সাহায্য করার কেউ ছিল না। মুন্তাহা মাথা গরম না করে কিভাবে পা ভাঙা আহত লোকটিকে সাহায্য করা যায় তা ভাবতে লাগলেন। তিনি সরকারের ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস সম্পর্কে জানতেন। তাই সময় নষ্ট না করে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে দ্রুত হেল্প ডেস্ক প্রতিনিধির কাছে সাহায্য চাইলেন। প্রতিনিধি খিলক্ষেত ফায়ার সার্ভিসের কাছে কলটি ট্রান্সফার করে দেন। ফায়ার সার্ভিসের টিম আহত বৃদ্ধ লোকটিকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। জানতে চাইলে মুন্তাহা বলেন, ‘দেশে এমন একটি সেবার দরকার ছিল। আর এজেন্টদের সহযোগিতায় আমি মুগ্ধ। ’ গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ২৯ মিনিটে ৯৯৯ হেল্প ডেস্ক নম্বরে ফোন করে সাবিউর রহমান ঢাকার টিকাটুলীর কামরুন্নেছা স্কুলের সামনে গ্যাস পাইপলাইন লিক হয়ে প্রচুর গ্যাস বের হচ্ছে জানিয়ে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা চান। কল সেন্টার এজেন্ট নাইমুর নাইম ফোনটি কাছের ফায়ার সার্ভিসে ট্রান্সফার করে দেন। ফায়ার সার্ভিস অফিস বিষয়টি গ্যাস নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানাতে বলে। পরে কলটি তিতাস গ্যাস কন্ট্রোল সেন্টারে ট্রান্সফার করা হয়। সেই রাতে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা সাবিউরের ঠিকানা নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে গ্যাস লিকেজ বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।17820863_10212275439022556_842614900_n জরুরি মুহূর্তে ৯৯৯-এর মাধ্যমে সেবা পেয়ে সন্তুষ্ট জানিয়ে সাবিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে এমন একটি সেবা পাওয়া যাবে এটা ভাবতেই অবাক লাগছিল। মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে তিতাসের লোকজন এসে গ্যাসের লিকেজ বন্ধ করেন। এ জন্য কোনো টাকা-পয়সা খরচ হয়নি। ’ ৯৯৯-এর কল সেন্টার এজেন্ট রানী আক্তারকে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর থেকে ফোন করে এক নারী জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন করে। আজ কিছুক্ষণ আগে তাঁকে এবং তাঁর তিন বছরের বাচ্চাকে মারধর করে একটি ঘরে আটকে রেখেছে। তিনি পুলিশের সহায়তা চান। কল সেন্টার এজেন্ট তাঁর অভিযোগটি উত্তরা পশ্চিম থানায় ট্রান্সফার করলে কর্তব্যরত অফিসার ফোর্স পাঠাচ্ছেন বলে আশ্বস্ত করেন। ঘণ্টাখানেক পর ওই বাসা থেকে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে। তিনি বলেন, ‘পুলিশের সহায়তায় তাৎক্ষণিক নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। তবে সংসারে শান্তি ফেরেনি। এখন আমি ঢাকায় আমার বাবা-মায়ের বাসায় বসবাস করছি। সন্তান ছোট থাকায় এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। ’ গত ১৩ মার্চ বিকেল ৩টা ৫২ মিনিটে রাজবাড়ী জেলার কালুখালী থানার নাঈম ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ৯৯৯ জরুরি সেবায় ফোন করে জানান, রাজ্জাকখালীর জুটমিলে বিশাল আকারে আগুন লেগে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কল সেন্টার এজেন্ট ঝর্না খাতুন বলেন, ‘দ্রুত সহযোগিতা চেয়ে আমরা ওই নাগরিকের কলটি ফায়ার কন্ট্রোলে ট্রান্সফার করি এবং ফায়ার কর্মকর্তা তাঁর ফোন নম্বরটি নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে ফায়ার সার্ভিস টিম ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ’ এভাবে অনেকের কাছেই সময়ে-অসময়ে বিপদের সহায় হয়ে উঠছে ৯৯৯ জরুরি সেবা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে পরিচালিত ৯৯৯ সেবা এরই মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গত বছরের ১ অক্টোবর পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ৯৯৯ কল সেন্টারটি ২৪ ঘণ্টা খোলা আছে। চলমান গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জরুরি সময়ের সেবা নিয়ে আরো একটি উন্নত ৯৯৯ সেবার ডিজাইন করছে আইসিটি ডিভিশন। ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস’ নামে চালু হওয়া এই পাইলট প্রকল্পটি থেকে নাগরিকরা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টা এই নম্বরে ফোন করে সহায়তা পাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে পরিচালিত ৯৯৯ জরুরি সেবা হচ্ছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ পরিচালিত একটি উদ্যোগ, যেখানে দেশের যে কেউ জরুরি প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশি সাহায্য, অ্যাম্বুল্যান্স সহায়তা পেতে পারে। যেকোনো মোবাইল নম্বর থেকে সম্পূর্ণ টোল ফ্রি কল করে কল সেন্টার এজেন্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের কাছ থেকে এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সূত্র জানায়, গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭৪৬ জন ৯৯৯ জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করেছে। এর মধ্যে সাত লাখ ৬১ হাজার ৬০৫টি জরুরি ও অন্যান্য সেবা নিয়েছে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস-সংক্রান্ত সহায়তার পরিমাণ ছিল ৩০ শতাংশ, পুলিশ সহায়তার পরিমাণ ছিল ৬৩ শতাংশ এবং অ্যাম্বুল্যান্স সহায়তার পরিমাণ ছিল ৬ শতাংশ। এ ছাড়া গ্যাস সমস্যাজনিত অভিযোগের পরিমাণ ছিল ১ শতাংশ। এরই মধ্যে ৯৯৯ জরুরি সেবার মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ৪৬ হাজার ৪৭৩ বার ডাউনলোড হয়েছে। চ্যাট করেছে ৯৬ হাজার ২৬৬ জন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক বলেন, ‘জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করছে। এরই অংশ হিসেবে সরকারিভাবে নাগরিকদের জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ সেবা চালু করা হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে যে পরিমাণ সাড়া পেয়েছি তাতে আমরা অভিভূত। ’ জুনাইদ আহেমদ পলক বলেন, এই সেবায় নিত্যনতুন বিষয় সংযোজন করা হচ্ছে। এমনকি এই সেবায় প্রতিবন্ধীদেরও সম্পৃক্ত করতে ৯৯৯ অ্যাপে বাংলায় ভয়েস সুবিধা চালুর পাশাপাশি চ্যাট বট চালু করা হয়েছে। সেবাটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজনীয় আইনকানুন সংশোধন এবং পৃথক নীতিমালা তৈরির পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে জানান আইসিটি প্রতিমন্ত্রী। তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে এই কল সেন্টারে মোট ৮৬ জনের একটি দল কাজ করছে। প্রতি শিফটে ২৫ জনের দক্ষ ইমার্জেন্সি কল টেকার কাজ করেন। তবে কলের চাপ সামাল দিতে কল সেন্টারের সম্প্রসারণ প্রয়োজন। সারা দেশের সব থানা, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুল্যান্সকে একটি প্রযুক্তিগত নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে এসে ৯৯৯-এর সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হবে, যাতে একসঙ্গে সব অভিযোগ তদারকি এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় জরুরি সেবা গ্রহণের হার বাড়ছে জানিয়ে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি প্রকল্পের কর্মসূচি পরিচালক মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত চার মাসে মোট সেবার ৪৮ শতাংশই দেওয়া হয়েছে ঢাকায়। ৫২ শতাংশ সারা দেশে। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে গাজীপুর থেকে ১১ শতাংশ, চট্টগ্রাম থেকে ৫ শতাংশ, নীলফামারী থেকে ৫ শতাংশ, সিরাজগঞ্জ থেকে ৪ শতাংশ। এ ছাড়া কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী, মানিকগঞ্জ, যশোর, জামালপুর, গাইবান্ধা ও দিনাজপুর জেলা থেকে ২ শতাংশ করে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ’ কল সেন্টারের পাশাপাশি ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সেবার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ থেকে কল সেন্টারে সরাসরি ফোন, লাইভ চ্যাট, বিভিন্ন তথ্য খোঁজার জন্য সার্চ অপশন ব্যবহার করা যাবে। এই অ্যাপে জরুরি সেবার মধ্যে আছে হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশি সহায়তা নেওয়ার ব্যবস্থা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়াও এই অ্যাপে সরকারের বিভিন্ন সাধারণ সেবা ও জীবন-জীবিকা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য রয়েছে, যা ব্যবহারকারীর বিভিন্ন প্রয়োজনে কাজে লাগবে। এই তথ্য প্রতিনিয়ত সংযোজন ও হালনাগাদ করা হচ্ছে বলে জানান আইসিটি প্রতিমন্ত্রী।আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে