‘বিমান থেকে নামার আগে মাথায় হাত দিয়ে বঙ্গবন্ধু কি যেন চিন্তা করছিলেন’

আশিক রহমান : ঢাকা তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামার কিছুক্ষণ আগে মাথায় হাত দিয়ে বঙ্গবন্ধু কি যেন চিন্তা করছিলেন। অন্যদিকে দেশে ফেরার আনন্দ করছিলাম আমরা। উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, আপনি কী চিন্তা করছেন? উনি বললেন, দেখো এই যে অসম্ভব সম্ভব হলো, স্বাধীন বাংলাদেশকে এখন আমরা সামনে থেকে দেখব, তা সম্ভব হয়েছে শুধু জনগণের ঐক্যের কারণে। আমি ভাবছি, চিন্তা করছিÑ আমাদের এই ঐক্য যদি না থাকে, ঐক্যটি যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আমাদের স্বাধীনতাটাই বিপন্ন হবেÑ আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারির স্মৃতিচারণ করলেন সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন।

তিনি বলেন, একসময় আমাদের কোনো নাগরিত্ব ছিল না। দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক বলতাম নিজেদের। আসলে কোনো শ্রেণিরই নাগরিক ছিলাম না আমরা, ছিলাম প্রজা। কারণ আমাদের কথার কোনো মূল্য ছিল না। রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিলাম। কিন্তু রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক হলেও আমাদের দাবি ছিল, সংখ্যালঘুর। সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে তো এসব দাবি করতেও হয় না। আমাদের চব্বিশ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল, লাঞ্ছনা-বঞ্চনার-শোষণের। সব ক্ষেত্রেই আমাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। চাকরি, পড়ালেখা, নাগরিক হিসেবে পাওনা রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হোক, আমাদের তা প্রাপ্য।

স্বাধীনতার পর আমরা সংসদ গঠন করলাম। সংবিধান প্রণয়ন করলাম। সংবিধানে স্পষ্টভাবে লিখেছিলামÑ জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে। প্রজা থেকে নাগরিক হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করলাম। সমাজে কোনোরকম বৈষম্য থাকবে না। আমরা তো বৈষম্যের বিরুদ্ধেই লড়েছিলাম একাত্তরে। পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের বাধ্য করেছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার করেছি আমরা। এই সময়ে আমাদের অনেক পাওয়া না পাওয়ার হিসাবও আছে। রয়েছে অতৃপ্তি। কিন্তু এই সময়ে আমাদের অর্জনও অনেক। প্রাপ্তিও আছে অনেক। এই সময়ে অনেক উত্থানপতন আমরা দেখেছি। এই ৪৬ বছরে সব সময় সাংবিধানিক শাসন ছিল না। যখনই সংবিধান ছিল, তার ভিত্তিতেই আমরা কিছু কিছু দাবি করেছি, দাবি আদায়ও করেছি। এখনো অনেক দাবি আদায় বাকি, সেই দাবি আদায়ের অপেক্ষায় রয়েছি আমরা।

ড. কামাল হোসেন বলেন, অনেক আকাঙ্খা আমাদের আছে, যে আকাঙ্খা মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের আকাঙ্খা। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দেওয়া শহীদেরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্নÑ সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করাই হলো স্বাধীন বাংলাদেশের লক্ষ্য। লাখো শহীদ ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, আমাদের স্বপ্নের কিছুটা বাস্তবায়ন হয়েছে, বাকিটা অপেক্ষমান।

তিনি বলেন, জনগণ কতখানি ক্ষমতার মালিকের ভূমিকায় থাকতে পারছেÑ এই প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের মালিক হতাম, ক্ষমতা ভোগ করতাম, তাহলে সেই অপূর্ণতা আমাদের উত্তরসূরিরা পূরণ করে দিত। সংবিধানের লেখায় রাষ্ট্রের মালিক সবাই, বাস্তবে মালিকের ভূমিকায় আর থাকতে পারছি কোথায়?

বাঙালি চিরকালই বীর। কোনোদিন অন্যায়কে মেনে নেয়নি তারা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখনই আমাদের বিজয় এসেছে। ঊনসত্তর কিংবা সত্তরের কথা বলুন আমরা সেখানে বিজয়ী। এমনকি এরশাদের বিরুদ্ধে যখন নব্বইয়ে আন্দোলন করছি তখনো বলা হচ্ছিলÑ এরশাদের সঙ্গে পারা যাবে না। কারণ তার সঙ্গে অন্যশক্তি ছিল। কিন্তু জনগণের শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। সেই শক্তিতেই আমরা বিজয়ী। আমাদের যে ইতিহাস, যে ঐতিহ্যÑ অন্যায়ের কাছে আমরা কখনোই মাথানত করি না। এটা আমাদের ঐতিহ্য। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা, অন্যায়ের কাছে মাথানত না করা। সাহসের সঙ্গে মাথা উচু করে, ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়া।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে