মাকে খুঁজে ফিরছে মিথিক…

ফাষ্ট নিউজ টোয়েন্টিফোর.কম ডেস্ক:

মাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না মিথিক। তার চোখে মুখে বিষণ্ণতা। কখনও নির্বাক হয়ে কী যেন ভাবছে। স্কুলেও যাওয়া হয়নি ক’দিন হলে।  গত ২৩ আগস্ট শহরের স্টেডিয়ামপাড়ার বাসা থেকে শিক্ষিকা মাহমুদা খন্দকার মুক্তির (২৫) মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মুক্তির একমাত্র সন্তান মিথিক (৮)। সে শহরের বলিদাপাড়া মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। বেশিরভাগ সময় মিরপুর উপজেলার মশানবাজারে নানা-নানীর সঙ্গেই থাকে।

মিথিককে তার মায়ের লাশ দেখতে দেয়া হয়নি। তবে নানা আবু সাইদ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তার মা আর ফিরবে না। কিন্তু নানার কথা বুঝতে পারছেনা মিথিক। তার বিশ্বাস, মা কোথাও বেড়াতে গেছে। ক’দিন পরেই ফিরবে।

শিশু মিথিকের কথা ভেবে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ছে নানা, নানী আর পরিবারের সদস্যরা।

বছর দশেক আগে কুষ্টিয়া শহরের স্টেডিয়ামপাড়ার সাংবাদিক মিলন মাজহারের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে মুক্তির। পরে তারা বিয়ে করেন। তবে মিলনের এটা দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবছর সংসার করার পর মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপরেই মুক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে মিলেন। মিথিক মিলন-মুক্তি দম্পতির একমাত্র সন্তান।

মাহমুদা খন্দকার মুক্তি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার গোবিন্দগুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন সহকারী শিক্ষক। আর মিরপুরের মশান গ্রামের খন্দকার আব্দুল হাইয়ের মেয়ে।

মিলন মাজহার কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকতা করলেও কয়েক বছর আগে ঢাকায় চলে আসেন। সেখান একটি অনলাইন নিউজপোর্টালে কাজ করার চেষ্টা করেন। কিছুদিন আগে তিনি কুষ্টিয়ায় ফিরে যান।

মুক্তির চাচা আবু সাইদ উকিল জানান, কয়েকদিন ধরেই মুক্তি আর মিলনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শোনা গিয়েছিল মুক্তির কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে রাগ করেছিল মিলন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছিল। বিষণ্ণ মন নিয়েই স্কুলে পড়াতে যেত মুক্তি। তবে ভাই-ভাবি ভেবেছিল, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ রকম মান-অভিমান তো হতেই পারে। কদিনেই ঠিক হয়ে যাবে।

মুক্তির মা হামিদা খাতুন জানান, গত রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে আমার জামাই ফোন করে বলে মুক্তি আত্মহত্যা করেছে। আমি স্টেডিয়াম পাড়ায় জামাইয়ের বাসায় গিয়ে দেখি আমার মেয়ের নিথর দেহ উপুড় হয়ে পড়া অবস্থায় রয়েছে।

মুক্তির বাবা খন্দকার আব্দুল হাই জানান, শনিবার (২২ আগস্ট) রাতের কোনো এক সময় আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়। পরদিন সকালে মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর বিভিন্ন সময় কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে।

নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানায়, মিলন মাজহারের পরিবার প্রভাবশালী। তারা ক্ষমতাসীন দলেন সমর্থক। পুলিশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, মিলনের সাংবাদিক পরিচয় থাকায় সহকর্মীরাও এ সম্পর্কে বেশি কিছু লিখতে আগ্রহী হচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, মুক্তি নিহত হওয়ার পরে তার মা হামিদা খাতুনকে মিলন মাজহারের বন্ধুরা বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে ফোনে হুমকি দিচ্ছেন। এ ঘটনায় অনেকটা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে মুক্তির পরিবারের সদস্যরা।

এর মধ্যে বুধবার দুপুরে কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে মুক্তির পরিবারের সদস্যরা। তারা মুক্তি হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন মিলে পরিকল্পিতভাবে মুক্তিকে হত্যা করেছে।

মুক্তির চাচা আবু সাঈদ উকিল আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, মুক্তির ছেলে মিথিককে কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছে না যে, তার মা আর নেই। ছেলেটির দিকে তাকালে বুকটা হু হু করে ওঠে। তার বাবাও ছেলের কোনো খোঁজ-খবর নিচ্ছে না। এমনি মুক্তির লাশ উদ্ধারের সময় উপর তলা থেকে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেউই দেখতে আসেনি। মুক্তিকে হাসপাতালে নেয়া কিংবা দাফনের সময় মিলন মাজহারকে দেখা যায়নি। এ নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে। এতকিছুর পরেও মিথিককে নিয়ে তার বাবা বা চাচাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে