মাগো তুমি কেমনে থাকো একলা ঘরেতে

আশরাফুল ইসলাম:

যখন মাকে ভালবাসতে শিখলাম তার আগেই তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক দুরে না ফেরার দেশে। যেখান থেকে কখনও কেউ কোন দিন ফিরে আসে না।আমার বয়স যখন ১৮-১৯ ছুই ছুই তখন আমি মা শব্দটার ঠিক মানে বুঝতাম না। আসলে এখনকার কথা বাদ দিয়ে যদি ২০০০ সালের দিকে ফিরে যায় তাহলে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলের আর কি বুদ্ধিই থাকবে যেখানে তেমন কোন প্রযুক্তি ও শিক্ষারআলো নেই।

যাইহোক, আমি ২০০২ সালে এসএসসি পাস করি। যা ছিলো আমার বংশের প্রথম কোন ছেলে মেট্রিকপাস করা একজন । মনে অনেক আশা ছিলো ভালো কলেজে পড়বো কিন্তু একমাত্র ছেলে হওয়াতে মা কোনো মতেই রাজি নয়। তাই পাশের গ্রামের একেবারে নতুন হওয়া একটি কলেজে ভর্তি হওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না। কিন্তু কোন কিছুতেই লেখাপড়ায় মন বসাতে পারছিলাম না। তাই দেখে ।আমার আব্বা উপজেলার একটি কলেজে ক্লাশ করার ব্যবস্থা করে দিলো এবং উপাজেলা শহরাধীন একটি মেসে থাকতে শুরু করলাম। তখন মোবাইলের এতো ব্যবহার শুরু হয়নি তাই বাধ্য হয়েই প্রতি সপ্তাহেই বাড়ি যেতাম মাকে দেখার জন্য। মা অধির অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকতো আমার জন্য,এই ভাবেই একটি বছর পার হয়ে গেল।

সাল ২০০৪ আমার মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায়। খবর পেয়ে আমি ছুটে যায় বাড়িতে দেখি মা মলিন মুখে বসে আছে। আমাকে দেখে প্রাণ ফিরে পেয়ে হাসিমাখা মুখে বলল আব্বু আমার তেমন কিছুই হয়নি। তুমি কোন চিন্তা করো না।তার কিছু দিন পর আমিও হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে যায় যাতে আমার এইচএসসি পরীক্ষা বন্ধ করতে হয়। মায়ের সাথে আলাপকালে কোন এক সময় আমি বলে ফেলি মা, আমি হয়তো আর বাচবো না।হঠাৎ দেখি মায়ের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল পড়ছে এবং মুখে একটি কথা বলল সেই কথাটি আজও আমার কানে সারাক্ষণ বাজে কথাটি ছিলো এই, ‍‍‌‌‌“আল্লাহপাক যেন আমার আয়ুস্কাল দিয়ে আমার ছেলেকে বাচিয়ে রাখে,তুমি আমার অনেক কষ্টের ও আদরের ছেলে যার জন্য আল্লাহপাক আমাকে অনেক বছর অপেক্ষায় রেখে ছিলো।“ ঐদিন মায়ের কাছে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ অনেক কথা হলো কথার মাঝে আরেকটি কথা হলো যে, তোমার ছোটবোন কে দেখে রেখো। মায়ের কথাগুলো আমি ঠিক তেমনভাবে বুঝতে পারি নাই, সেই সময় কিন্তু এখন বুঝি।

মাঝখানে কয়েকমাস অতিবাহিত হলো একদিন বিকেলের দিকে সংবাদ পেলাম মা খুব অসুস্থ হয়ে গেছে শুধু আমার কথা বলছে। তাই আমি দেরি না করে তাড়াতাড়ি চলে গেলাম মায়ের কাছে। বাড়িতে যেয়ে দেখি মায়ের অচেতন অবস্থা তখন গ্রামের রাস্তাঘাট ভালো ছিলো না। তাই ঐ সময় হাসপাতালে নেওয়া হলো না।রাতে মায়ের মুখ দিয়ে শুধু একটি কথাই ভেসে আসছিলো আমার ছেলে,আমার ছেলে। ঐ রাতে আমি মায়ের কোলের মধ্যে শুয়ে থাকি মা আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলো যেন কিছুতেই আমাকে ছাড়বে না কিন্তু কি যে বলছিলো গুনগুন করে অচেতন অবস্থায় তা আমরা কেউ বুঝতে পারি নাই।সকালে সবাই বলল যে হয়তো জিনের আছর হয়েছে।তাই কবিরাজ ডাকা হলো কিন্তু তাতেও কোন কাজ হলো না। তারপর সেই অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো।

সারাদিন হাসপাতালে থাকার পরও কোন জ্ঞান ফিরলো না । আব্বার সাথে কথা বলে আমি আর আমার ছোট বোনের স্বামী বিকেলের দিকে বাড়ি চলে আসলাম। আমার বাড়িতে আসা মাত্র ২০ মিনিট হয়েছে আমি মাত্র খাওয়ার জন্য ভাত মুখে দিয়েছি। ঠিক সেই সময়ে আমার ছোট চাচা গ্রামের বাজার থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে কেদে বলল, আব্বুরে তুমিতো এতিম হয়ে গেলে তোমার মা আমাদের সবাইকে পর করে তার আসল ঠিকানায় চলে গেছে।

‍‌‌‌‌”মায়ের কথা মনে হলে অশ্রু শুধু ঝরে।

মা যে আমার চলে গেছে চিরদিনের তরে।”

তারপর আর কিছুই মনে নেই কয়েক ঘন্টা কি হয়েছিলো? রাত ১০-১১ টার দিকে মায়ের দাফন করে বাড়িতে এসে সেই যে,বাড়িটি ফাকা হয়ে গেল আজও আমার কাছে ফাকা হয়েই আছে। আমার আব্বা তার কিছুদিন পরেই আবার বিয়ে করেছে, কিন্তু আমি আমার মাকে ফিরে পাইনি, জানি আর কখনও তাকে এই পৃথিবীতে খুজে পাবো না।

“সয়নে স্বপনে শুধু মা,তোমার কথা মনে হয়।

কতদিন দেখি না তোমায়, ভুলে কি গেছো আমায়।”

সেই যে ঘর ছেড়েছি আর ঘরে ফেরা হয়নি মানে আমাকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার আর কেউ অবশিষ্ট নেই।কোন দিন হয়তো আর পারবো ও না সেই ঘরে ফিরতে।গভীর রাতে যখনই ঘুমাতে যায় মায়ের কথা মনে হয় খেয়াল করে দেখি চোখের কোণের জল গড়িয়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছে, হয়তো যতদিন বাচবো ততদিনই এমন হবে।

“মাগো তুমি কাদছো কেন একলা বাড়িতে

তোমার আমার দেখা হবে ঐ- না জান্নাতে।”

শুধু আফসোস, বেচে থাকতে তোমাকে ভালোবাসতে পারি নাই মা কিন্তু এই এগার বছর প্রতিটি মুহুর্ত তোমার ভালোবাশা অনুভব করেছি। আর মনে হয়েছে শুধু তোমাকেই ভালবাসি মা তোমাকেই ভালোবাসি। জানি এই কথাটা লিখে বোঝাবার ভাষা কোন লেখকের নেই। তারপরও মনকে শান্তনা দেওয়ার জন্যই বার বার লিখি ।

সেই তুমি কিভাবে তোমার অতি আদরে,কষ্টের সন্তানদের ছেড়ে একা একা থাকো অবুঝ মন তা কখনও মানতে পারে না । তাই বার বার মন বলে উঠে,

মাগো তুমি কেমনে থাকো একলা ঘরেতে,

তোমার ছেলে কেদে ফেরে এই-না ধরাতে।

সকাল হলে কে বলবে মা,উঠরে বাবা উঠ,

তোমার ছেলে কেদে ফেরে এইনা ধরাতে।

বলতে তুমি আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে না,

এখন কেন দুরে থাকো কাছে আসো না।

তোমার ছেলে কেদে ফেরে এইনা ধরাতে।

এই লেখাটি লিখার সময় নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে জল পড়েছে অঝোর ধারায় । হাত বার বার থেমে যাচ্ছে আর লেখা সম্ভব নয়। সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে, যাদের মা বেচে আছে তারা যেন আমার মতো সারাজীবন আফসোস না করেন।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে