মাননীয় অর্থমন্ত্রী; এক, দুই আর পাঁচ টাকার ‘কয়েন’ কি পানিতে ফেলে দিবো?

গত কয়দিন আগে এক বিকেলবেলার কথা, আমাদের এলাকার একটা দোকানে গিয়ে বললাম, এককাপ চা’ আর একটা পান দিন তো! দোকানদার অন্য গ্রাহকের কাছে সদাই বিক্রয়ের ঝামেলায় ছিল ৷ এই সুযোগে আমি আমার পকেট থেকে দুইটা পাঁচটাকার ‘কয়েন’ বাহির করে দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে বলছি এই নিন দশটাকা, একটা চা’ আর একটা পান দিন তাড়াতাড়ি করে, আমার সময় নাই ৷দোকানদার আমার দিকে লক্ষ না করেই, চা-পান বানাচ্ছে তাঁর আপন মনে ৷ আগে আমাকে চা’ দিলো, পরে দিলো পানটা একটা কাগজে পেঁচিয়ে আমার হাতে ৷ আমি দোকানদারকে দুইটা পাঁচটাকার ‘কয়েন’ দিতে গিয়েই ঘটলো বিপত্তি ৷ আমি চা’তো আগেই গিলে ফেলেছি, পরে বানানো পানটা আমার হাতে না দিয়েই বলছে, যান-যান পান বেছুম না, চায়ের দাম দেন ৷

আমি: কে কী ওইছে ?
দোকানদার: এই টেকা আমি নিমু না ৷
আমি: কে টেকা কি ভাঙ্গা? যে চলতো না?
দোকানদার: হেইডা কওনের কাম নাই, কইছি নিতাম না, চায়ের দামটা দেন কাগজের নোট ৷
আমি: কিল্লাইগ্গা কন’, আমারে বুঝান! এই ‘কয়েন’ নিতেন না কে?
দোকানদার: এই টেকা কেউ নেয় না, আমিও নিতাম না ৷
আমি: কেডা নেয় আর কেডা না নেয় এইডা তো ‘ আমার দরকার নাই ৷ আমনের তন চা’ খাইছি, অহন পান চাইছি পান দেন ৷ এইলন দুইটা পাঁচটেকার ‘কয়েন’ দশটেকা, আমার তুনে আর কোন ভাংতি টেকা নাই, সব পাঁচশ টেকার নোট ৷

দোকানদার: কইছি তো এই কয়েন আমি নিমু না ৷ কয়েন কোন রুডিয়ালায়ও নেয় না, আমি নিয়া কী করুম কন? এই দেহেন কয়েনের গাদি ৷ হুদা এডিনা, আরো মেলা আছে বাসায়, হালাই রাখছি ৷ আর কয়দিন দেকমু, হেরপর পানিত হালাই দিমু, অার কী করুম ৷

আমার সাথেও সেদিন ভাংতি কোন টাকাই ছিল না, এই পাঁচ টাকার তিনটে ‘কয়েন’ ছাড়া ৷ দোকানদারের কথা শুনে, জোর করে চায়ের মূল্য হিসেবে পাঁচটাকার একটা ‘কয়েন’ দিয়ে দোকান থেকে বাহির হয়ে, অন্য দোকানে গেলাম ৷ সেখানেও একই রকম অবস্থা ৷ জিজ্ঞেস করলো, নোট নাই? কয়েল ‘ত’ চালাইতে পারি না, কেউ নেয়ও না ৷ যারেই হাদি হে কয়, এই যমের বোঝা নিতাম না ৷ অহন আমনে আইছেন এই “কয়েল” লইয়া, দেন-দেন নোট না থাকলে আর কী করা ৷

দোকানদারের কথা শুনে পানটা হাতে নিলাম ঠিক, কিন্তু পানটা আর মুখে দিতে পারছি না ৷ মনটা খারাপ করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম দোকানের সামনে ৷ দোকানদার তখনো আমার দিকেই ফলো করছে, বলছে বাবু, রাগ করছেন? রাগ করলে আর কী করুম! এই দেহেন কয়েন, দুইটেকা আর পাঁচটেকার “কয়েন” ৷ পঞ্চাশটা কইরা পোটলা বাইন্ধা রাখছি বহুত আগে, অহনো কারোরে দিতে পারি নাই ৷
img_20161015_1122492
ছবিতে দোকানদার ‘কয়েন’ এর পুটলিগুলি দেখাচ্ছে, বলছে দোকানে ক্যাশ-বাক্স ভরে গেলে বাসায় নিয়ে ফেলে রাখি ৷

এসব দেখেশুনে ভাবছি নিজের কাছেও আছে অনেকগুলে “কয়েন”, আমি কাকে দিব? ব্যাংকেও এই ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন’ নেয় না, পোস্ট আফিসে নেয় না, তাহলে এই ‘কয়েন’ কীভাবে কী করবো? শেষমেষ এসব ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন’ কি পানিতে ফেলে দিবো? মনে হয় এছাড়া আর কিছু করার থাকবে না যদি দেশের অর্থমন্ত্রণালয় এসব ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন স্ব-ইচ্ছায় উঠিয়ে না নেয় ৷
img_20161014_2309132ছবিতে ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন’ দেখাচ্ছে একজন দোকানদার ৷

মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করি, মাননীয় মন্ত্রীমহোদয়, আপনি দেশের অর্থভাণ্ডার ৷ আপনি মানুষের কাছে ন্যায্যমূল্য দিয়ে এই ধাতবমুদ্রার ‘কয়েনগুলি’ উঠিয়ে নিন ৷ আমাদের এই গরিব দেশে এত নানাবিধ মুদ্রার দরকার কী মাননীয় অর্থমন্ত্রী? যেকোন মুদ্রা একপ্রকার থাকলেই তো হয়, যেমন দশটাকার কাগুজে নোট, বিশটাকার কাগুজে নোট, পঞ্চাশটাকার কাগুজে নোট, একশটাকার কাগুজে নোট, আর পাঁচশটাকা ও একহাজার টাকার কাগুজে নোট আছে আমাদের দেশে ৷ এসব কাগুজে নোটের বিপরীততে আর কোন ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন’ নাই, তাই এসব নোটের যথাযথ চাহিদা ও সমাদর ৷
img_20161015_084235
আর এই পাঁচটাকা ও দুইটাকার কাগুজে নোটের বিপরীততে আছে ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন’, তাই ‘কয়েন’ এর প্রতি এত অনিহা, অনিচ্ছার ভাব প্রকাশ দেশের মানুষের ৷ কেন না, এই পাঁচটাকার মুদ্রা আর দুইটাকার ধাতবমুদ্রা পঞ্চাশটা একসাথে কেউ নিতে চায় না ৷ যেমন ওজন, তেমন ঝামেলা, জামার পকেটে ও রাখা যায় না ওজনের কারণে ৷ অনেক সময় জামা বা পেন্টের পকেট থেকে পড়ে হারিয়ে যায়, যার কারণেই এসব ধাতবমুদ্রার প্রতি মানুষের অনিহা আর বিরক্তি ৷ যদি একপ্রকারের থাকতো তবে আর বাংলাদেশ সরকারের এই ‘কয়েন’ এর প্রতি এত অনিহা অনিচ্ছা থাকতো না দেশের জনগণের ৷ মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয়, আপনি জানেন যে, আমাদের দেশে যখন ঘোষণা হয় নতুন মুদ্রা বাজারে আসছে, তখন থেকেই কিছু মানুষ উ্ঁতপেতে থাকে সেই নতুন মুদ্রা সংগ্রহ করার জন্য ৷ সেসব নতুন মুদ্রা সংগ্রহের কাড়াকাড়ির কাহিনী আমরা পত্রিকান্তেও বহু পড়েছি, মাননীয় অর্থমন্ত্রী ৷
img_20161015_1126482

ছবিতে এক দোকানদার দেখাচ্ছে তাঁর ক্যাশ-বাক্সের ‘কয়েন’৷

সেই কাহিনী থাকে অল্পকিছুদিন, যখন পুরাতন হয়ে যায়, তখন আর এই নতুন মুদ্রা সংগ্রহের কোন ইচ্ছা থাকে না কারোর, কারণ: এ তো পুরানো, দরকার নেই ৷ এমন শখের বশে দেশের সবাই এই পাঁচটাকা আর দুইটাকার ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন’ ও বহু মানুষ বহুযত্নে সংগ্রহ করে রেখেছিল স্বর্ণমুদ্রা মনে করে ৷ এরকম মজুদ করে রাখা হতো, বাজার বা মেলা থেকে কেনা বাংলার মাটির ব্যাংকে, এর ফলেই সময় সময় বাজারেও দেখা দিতো এই পাঁচটাকা আর দুইটাকার ‘কয়েন’ এর সংকট ৷ এখন আর সেই সংকট নেই মাননীয় অর্থমন্ত্রী, এখন বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার দশগুন সমান হবে এই পাঁচটাকা আর দুইটাকার ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন’ ৷ তাই এর চাহিদা নেই, যেন ভিনদেশের একটা মুদ্রা, অথচ নিজের দেশের মুদ্রা, দিতে গেলে বাঁধে জগরা ৷ যদি সব মুদ্রা একরকমের হতো, তবে আর এরকম বিপত্তি ঘটতো না, সবাই অন্যান্য কাগজের নোটের মতই স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করতো, সম্মান করতো ৷

পরিশেষে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইবো যে, এই পাঁচটাকা ও দুইটাকার ধাতবমুদ্রা ‘কয়েন’ সবাই যদি গ্রহণ করতে অনিহা অনিচ্ছা প্রকাশ করে, তাহলে এই ধাতবমুদ্রার ‘কয়েন’ কি পানিতে ফেলে দিবো? নাকি ঘরে রেখে ‘কয়েন’ ধুয়ে পানি খাবো? প্রশ্ন শুধু থেকেই যায় ৷

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে