স্বাধীনতা মহান আল্লাহর নেয়ামত

ওমর শাহ: মহান আল্লাহ যেসব অগণিত নেয়ামতের মাধ্যমে মানব জাতিকে ধন্য করেছেন, তার মধ্যে স্বাধীনতা এক বিশেষ নেয়ামত। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার যে কত বড় মাপের, তা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধরাই কেবল অনুধাবন করতে পারেন। তাই স্বাধীনতাকে খর্ব করার অধিকার কারো নেই। এ অধিকার খর্ব করা যেমন মানবাধিকার পরিপন্থী; তেমনি মহান আল্লাহর আইনের বিরোধীও বটে।

ইসলাম গতানুগতিক কোনো স্বাধীনতার স্লোগান নিয়ে আসেনি, ইসলাম মানবতার সামগ্রিক জীবনে মুক্তি, সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বাস্তব কর্মসূচি দিয়ে মানুষকে সৎ পথে চলার দিকনির্দেশনা দিতে এসেছে। ইসলাম মানব জীবনে ধর্মীয় স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি দিয়ে ধন্য করেছে।

ইসলাম রক্তপাত, হানাহানি, মারামারি, হত্যা অথবা ইসলাম গ্রহণে জবরদস্তির অনুমোদন দেয় না, কিন্তু অন্যায়, হত্যা, স্বাধীনতা হরণ প্রতিরোধে যুদ্ধ করতেও নির্দেশ দেয়। নিজ দেশকে পরাধীনতামুক্ত রাখতে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগে নির্র্দেশ দিয়েছে ইসলাম। কেননা কোনো জুলুমকেই প্রশ্রয় দেয় না ইসলাম। জালিমদের খপ্পর থেকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে লড়াই করার তাগিদ দিয়ে আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের কী হলো যে, তোমরা যুদ্ধ করবে না আল্লাহর পথে এবং অসহায় নর-নারী এবং শিশুদের জন্য যারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এই জনপদ- যার অধিপতি জালিম, তার থেকে আমাদেরকে অন্যত্র নিয়ে যাও, তোমার নিকট থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার নিকট থেকে কাউকেও আমাদের সহায় কর’ (সূরা নিসা : ৭৫)।
জুলুম ও শোষণমুক্ত, আল্লাহদ্রোহী মানসিকতামুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে কল্যাণরাষ্ট্রে অক্ষুণ্ণ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। কেননা স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা অধিক কঠিন। তাই তো আল্লাহ আদেশ করেছেন, ‘তোমরা সর্বদাই তোমাদের শত্রুদের প্রতিহত করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে সাবধান থাকবে। এই প্রস্তুতি দ্বারা তোমরা তোমাদের এবং আল্লাহর দুশমনদের ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখবে’ (সূরা আনফাল : ৬০)।

ইসলাম স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও সে স্বাধীনতা বল্গাহীন স্বাধীনতা নয়। সে স্বাধীনতা কিছু বিধিনিষেধ দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত। ইসলামে স্বাধীনতা হচ্ছে নিজেকে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করা। আল্লাহ বলছেন, ‘বল, আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে’ (সূরা আনয়াম : ১৬২)। ইসলাম মানুষকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরতান্ত্রিকতাকে মোটেও প্রশ্রয় দেয়নি। দলের ঊর্ধ্বে ওঠে ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন, দুর্বল-সবল সকলের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি আল্লাহ তোমাকে যা জানিয়েছেন সে অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা কর’ (সূরা নিসা : ১০৫)। ইসলাম মানুষকে বৈধভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ করার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু জেনা-ব্যভিচারকে নিষেধ করেছে। বলা হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ’ (সূরা বনি ঈসরাইল : ৩২)। ইসলাম পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা দিয়েছে, অশালীন পোশাক পরিধানে বারণ করেছে। হজরত উমর রা: বলেন, ‘নারীদের এমন আঁটসাঁট পোশাক পড়তে দিওনা, যাতে শরীরের গঠন পরিষ্ফুটিত হয়ে উঠে।’ ইসলাম মানুষকে পানাহারের স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু অপচয় করতে নিষেধ করেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আহার করবে ও পানাহার করবে, কিন্তু অপচয় করবে না’ (সূরা আ’রাফ : ৩১)। ইসলাম মানুষকে অর্থ উপার্জনের স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু অবৈধ পথ পরিহারের নির্দেশ দিয়েছে। বলা হয়েছে, ‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে’ (সূরা জুমু’আ : ১০)। ইসলাম বৈধভাবে অর্থ ভোগের স্বাধীনতা দিলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য রোধে ধনীদের সম্পদে একচ্ছত্র ভোগাধিকার দেয়নি। বলা হয়েছে, ‘তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক’ (সূরা জারিয়াত : ১৯)। অর্থ উপার্জনে ইসলাম ব্যবসাকে বৈধ করলেও সুদকে চিরতরে হারাম ঘোষণা করেছে। অর্থ উপার্জনের তাগিদ দিয়ে অন্যায় পথ অবলম্বন নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন’ (সুরা বাকারা : ২৭৫)।

ইসলাম শোষণমুক্তির কথা বলে। মানুষের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষকে আল্লাহর কাছে সমর্পিত হতে শিক্ষা দেয়। কাজেই মুসলমানের প্রকৃত মুক্তি ও সফলতা হলো পরকালীন মুক্তি ও সাফল্য। কোনো কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য না হওয়া পর্যন্তই মুসলমানদের স্বাধীনতা রয়েছে।

ইসলাম স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। বস্তুত দেশপ্রেম ও জাতিপ্রেমের কোনো বিকল্প নেই। দেশের প্রচলিত (ইসলাম বিরোধী নয় এমন) দেশীয় পণ্যকে প্রাধান্য দেয়া, জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা, অপচয় রোধ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলো হলো দেশপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এসব বিষয়ের প্রতি প্রতিটি নাগরিককে যেমন সজাগ থাকতে হবে, তেমনি শাসকদেরও এর প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে