হজযাত্রায় খরচ বাড়লো; ভোগান্তি কমবে কি?

সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন: গত বছরের নীতিমালার বেশ কিছু পরিবর্তনসহ ‘হজ প্যাকেজ ২০১৮’-এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বরাবরের মতো দুটি প্যাকেজ রাখা হয়েছে। দুটি প্যাকেজেই গতবারের তুলনায় খরচ বেড়েছে।

এবার প্রথম প্যাকেজে খরচ বেড়েছে ২১ হাজার এবং দ্বিতীয় প্যাকেজে খরচ বেড়েছে ১৫ হাজার টাকার মতো। আর বিমান ভাড়া বেড়েছে ১৪ হাজার টাকার মতো। ফলে সার্বিকভাবে বাড়ছে হজে যাওয়ার খরচ।

কিন্তু কথা হচ্ছে, খরচ বাড়লেও সুযোগ-সুবিধা যে বাড়েনি কিছুই। আগের ভোগান্তিগুলো নিঃশেষ হবে কিনা থেকে যাচ্ছে সে সন্দেহও।

দুঃখজনক হলেও সত্য-স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ বিমান ভাড়া গ্রহণ করা হয় হজের মৌসুমে তা তিনগুণ করা হয়! এ সমস্যা সমাধানে যেন কারও দায় নেই। সরকার কত কাজেই তো ভর্তুকি দেয়, তাহলে এক্ষেত্রে কেন নয়?

চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি সৌদি আরবের হজ কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মধ্যে হজ চুক্তি সম্পন্ন হয়। ২০১৮ সালের হজ পালনেচ্ছুদের নিবন্ধন শেষ হয়েছে অনেক আগেই। ২০১৯ সালের হজ নিবন্ধনও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে হজে যাবেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশি। চুক্তি অনুযায়ী এ বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭ হাজার এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ লাখ ২০ হাজার ১৯৮ জন হজে যেতে পারবেন। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২১ আগস্ট চলতি বছরের পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে।

গণমাধ্যমে প্রকাশ, সরকারিভাবে প্রথম প্যাকেজে মোট খরচ তিন লাখ ৯৭ হাজার ৯২৯ টাকা, গতবার ছিল তিন লাখ ৮১ হাজার ৫০৮ টাকা। একই সাথে দ্বিতীয় প্যাকেজে খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার ৩৫৯ টাকা, যা গতবার ছিল তিন লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ টাকা।

এক্ষেত্রে রয়েছে অস্বচ্ছতা। যেমন : এবার বেসরকারিভাবে হজের খরচ সর্বনিম্ন তিন লাখ ৩১ হাজার ৩৫৯ টাকা নির্ধারণ করা হলেও সর্বোচ্চ কত নেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে অরাজকতার সুযোগ থেকেই গেল।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের নীতির সঙ্গে ২০১৮ সালের নীতির বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে নিয়ম ছিল হজে যেতে চাইলে এনআইডি কার্ড বাধ্যতামূলক। তবে এবার একটি নতুন বিষয় যোগ করা হয়েছে।

সেখানে ৩ এর ১.১ ধারায় বলা হয়েছে প্রবাসীরা পাসপোর্টের মাধ্যমে প্রাক নিবন্ধন করতে পারবেন। প্রাক নিবন্ধনের পর এমআরপি পাসপোর্ট থাকতে হবে। এটার মেয়াদ থাকবে ছয় মাস।

আগে ছিল পুলিশ ভেরিভিকেশন দুইবার। এবার প্রাক নিবন্ধনের সময় পুলিশ ভেরিভিকেশন লাগবে না। ফলে ভেরিফিকেশন একবার করলেই চলবে। এ দুই ক্ষেত্রে অবশ্য কিছুটা হলেও সুফল মিলবে বলে ধরে নেওয়া যায়।

এবার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলা যাক। প্রতিবছরই দেখা যায়, প্রায় শেষ পর্যায়ে হজযাত্রীদের জন্য মোয়াল্লেম ফি বৃদ্ধি, মোয়াল্লেমের চুক্তি, বাড়িভাড়া, হজযাত্রীর ভিসা ইস্যু ও ভিসাপ্রাপ্ত হজযাত্রীদের বিমানের টিকিট সংগ্রহ না করায় হজ ব্যবস্থাপনায় হ-য-ব-র-ল সৃষ্টি হয়।

এর জন্য ধর্মমন্ত্রী হজ এজেন্সি মালিকদের দায়ী করলেও এজেন্সিগুলো দায়ী করে হঠাৎ মোয়াল্লেম ফি বৃদ্ধিকে। আবার এমনও শোনা যায়, ধর্ম মন্ত্রণালয় ও মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনের কিছু কর্মকর্তার গাফিলতি এমন অবস্থার জন্য দায়ী। যে পক্ষই দায়ী হোক না কেন-আমরা এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই।

গত বছরও হজযাত্রা শুরুর পর থেকে পূর্ববর্তী সময়ের ফ্লাইট বাতিলের রেকর্ড ছাড়িয়েছে বিমান। ভিসা জটিলতার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সব যাত্রী হজে যেতে পারবেন কি-না তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল অনিশ্চয়তা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে হজ অফিস ভিসা ও টিকিট কনফার্ম করার জন্য হজ এজেন্সিগুলোকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারির পাশাপাশি প্রত্যেক হজযাত্রীকেও বার্তা পাঠিয়েছিল। কিন্তু হজযাত্রাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা টিকিট সিন্ডিকেট চক্রের রাশ টেনে ধরতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

প্রশ্ন হচ্ছে, হজযাত্রা নিয়ে কৌশলে গড়ে ওঠা টিকিট সিন্ডিকেটকে কি থামানো যাবে না? অতি মুনাফালোভীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়?

জানা গেছে, দেশে হজযাত্রী বাড়তে থাকায় হাজারের অধিক এজেন্সির মধ্যে হজমৌসুমে শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। হাজি সংগ্রহে মরিয়া হয়ে ওঠে বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলো।

গ্রামে গঞ্জে থাকা মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদরাসা শিক্ষক, কারিসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে একত্রে নিয়োজিত করে তারা। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এজেন্সিগুলো ২ থেকে আড়াই লাখ টাকাতেও হজে পাঠাতে চুক্তিবদ্ধ হয়।

আবার, অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা হজযাত্রীদের কাছ থেকে প্যাকেজের সমান টাকা আনলেও এজেন্সিগুলোকে কম দেন!

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যথেচ্ছ হজ লাইসেন্স প্রদান মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই ডুবছে হজ ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে, সৌদি আরবে বাড়ি ভাড়া না করায় হজযাত্রীদের অনেকে ভিসা পান না। আবার ভিসা না হওয়ায় তাঁরা টিকিট করতে পারেন না।

ফলে এজেন্সিগুলো আগে আসন বুকিং দিলেও পরে নিশ্চিত না করায় হজযাত্রী সংকটে ফ্লাইট বাতিল হয় বা পিছিয়ে যায়। এছাড়া এজেন্সি মালিকেরা নির্ধারিত হজ প্যাকেজ থেকে হাতে কম টাকা পাওয়ায় ভিসা, সৌদিতে বাড়ি ভাড়া, মোয়াল্লেম ফি পরিশোধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ বাঁচাতে সময়ক্ষেপণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যার বিরূপ প্রভাব পড়ে পুরো হজ ব্যবস্থাপনায়। ঘটতে থাকে একের পর এক ফ্লাইট বিপর্যয়সহ নানা অনিয়ম। এতে দুর্ভোগের শিকার হন হজযাত্রীরা।

অবাক হতে হয় যখন শুনি, দেশে বর্তমানে বেসরকারি হজ এজেন্সির সংখ্যা ১ হাজারেরও বেশি। বিশ্বের আর কোনো দেশে এত সংখ্যক বেসরকারি এজেন্সি আছে কি?

অন্তত আয়তন ও জনসংখ্যা বিবেচনায় হলেও না থাকারই কথা। বেসরকারি হজ এজেন্সিদের সংগঠন-হাব সূত্রে জানা যায়, হাব প্রতিষ্ঠার সময় ২০০১ সালে সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১১৩টি। এরপর প্রতি বছর এ সংখ্যা বাড়তে থাকে।

২০০২ সালে ১৩৩টি, ২০০৩ সালে ১৬৬টি, ২০০৪ সালে ৩৬৩টি। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা এক লাফে গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৪৯টিতে। পরের বছর হয় ১ হাজার ১৯২টি, ২০১৫ সালে হয় ১ হাজার ২০৫টি আর ২০১৬ সালে হয় ১ হাজার ২৫৪টি।

বলা যায়, হজ ব্যবসায় লাভজনক হওয়ায় এর পরের বছর থেকে এজেন্সির সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। শোনা যায়, এক ব্যক্তির একটি থেকে ৫-৬টি পর্যন্ত এজেন্সি রয়েছে। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের নামে এজেন্সির নিবন্ধন নিয়েছেন তারা!

হজযাত্রায় মানুষের দুর্ভোগ-কষ্ট ও অনিশ্চয়তা এর আগেও দেখেছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পৃথিবীর সব দেশ যখন হজের প্রশ্নে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের দুর্ভোগ অনেকটাই নিরসন করেছে তখন আমাদের দেশে হজযাত্রীদের দুর্ভোগের কোনো শেষ নেই।

এর কারণ হতে পারে, ধর্ম পালন ও মানবসেবায় আজ জেঁকে বসেছে বহুমুখী বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের তৃণমূল পর্যায়ে আছে এক শ্রেণির দালাল ও ফড়িয়া।

যদিও যান্ত্রিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু অনিয়ম দূর করার কেন্দ্রীয়ভাবে চেষ্টা চললেও তার সাফল্য কত দিনে আসবে তা বলা মুশকিল।

একথা মানতেই হবে, হজ নিয়ে বাণিজ্যিক তৎপরতা, অনিয়ম ও দুর্ভোগ কেউ প্রত্যাশা করে না। কেউ চায় না পবিত্র নিয়তে হজ করতে গিয়ে কিছু মানুষের অসৎ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য পূরণের শিকারে পরিণত হতে।

গত বছরও হজ ব্যবস্থাপনার সমস্যায় হজে যেতে পারেননি অনেকেই। যেসব এজেন্সির কারণে গত বছর মানুষগুলো হজে যেতে পারেননি সেসব এজেন্সির কি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে?

আসলে দুর্নীতিটা হচ্ছে কোথায়, তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে যেন আগামীতে হজযাত্রীদের এ রকম ভোগান্তির শিকার হতে না হয়। আর হজযাত্রীদের হজে যাওয়া থেকে শুরু করে সার্বিক পরিস্থিতির সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। সূত্র: আওয়ার ইসলাম

শেয়ার করুন

কোন মন্তব্য নেই

উত্তর দিতে